জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও কাটেনি বিদ্যুৎ ও পানির সংকট

প্রকাশ:

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার পাহাড়ি জনপদ জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানের পর দৃশ্যপট অনেকটাই পরিবর্তিত হয়েছে। গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও অন্যান্য ইউনিটের ৩ হাজার ১৭৩ সদস্যের বড় যৌথ অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আগ্নেয়াস্ত্র, পাইপগান, গুলি, ককটেল, অস্ত্র তৈরির যন্ত্র ও সিসি ক্যামেরা উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে সেখানে পুলিশের তল্লাশিচৌকি রয়েছে এবং এস এম পাইলট ও আলীনগর উচ্চবিদ্যালয় এলাকায় দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হয়েছে। নিয়মিত টহল ও অভিযানের ফলে প্রকাশ্যে সশস্ত্র ব্যক্তিদের আনাগোনা বন্ধ হয়েছে এবং মানুষ আগের চেয়ে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারছেন। তবে এর মধ্যেও যৌথ বাহিনী ও র‍্যাবের ক্যাম্পে হামলা এবং পানির পাইপে বিষাক্ত দ্রব্য মেশানোর মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে, যা বাসিন্দাদের মনে এখনো ভয়ের ছাপ রেখে গেছে। গত ২৪ মে দিবাগত রাত দুইটার দিকে আলীনগরের যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে গুলি ছোড়া হয় এবং বুলডোজার দিয়ে অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করা হলেও বিদ্যুৎ ও পানির মতো মৌলিক পরিষেবাগুলো এখনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। স্থানীয় দোকানদার শাহ আলম জানান, ২০ বছর ধরে দোকান চালালেও তিনি বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে কখনোই বিল পাননি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বলছে, এলাকায় মাত্র ২২টি বৈধ সংযোগ থাকলেও সেখান থেকে অসংখ্য অবৈধ সাবলাইন ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাসিন্দারা এখনো ‘ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’-এর নামে কাগজে বিল পান এবং স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে নগদ টাকা জমা দেন। পিডিবির ষোলশহর বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ছানা উল্লাহ জানান, জঙ্গল সলিমপুরের সংযোগগুলোর বিপরীতে বকেয়া দাঁড়িয়েছিল ৭২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৪৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং বাকি ২৮ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। পিডিবির কর্মীরা বৈধ-অবৈধ সংযোগ যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছেন, তবে সব সংযোগ একসঙ্গে বিচ্ছিন্ন করলে পুলিশ ক্যাম্প ও সরকারি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

একইভাবে পানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও কোনো কেন্দ্রীয় সরকারি ব্যবস্থাপনা নেই। বিভিন্ন গভীর নলকূপ ও পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হয়, যার নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় প্রভাবশালীদের হাতে। ২৬ জুলাই আলীনগরে পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্পের পানির পাইপ কেটে কীটনাশক মেশানোর ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী অবশ্য দাবি করেছেন, এলাকাটি পুরোপুরি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের অভিযান চলছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উচ্ছেদ আতঙ্কও বিরাজ করছে। আলীনগরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রভাবশালী মো. ইয়াসিন ও তাঁর সহযোগীরা গ্রেপ্তার না হলে তারা আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। স্থানীয়দের দাবি, সরকার যেন উচ্ছেদের পাশাপাশি তাদের বিকল্প আবাসন বা স্থানান্তরের ব্যবস্থা করে। এদিকে খাসজমির হিসাব নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে; ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সরকারের উচ্চপর্যায়ের সভায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমির কথা উল্লেখ করা হলেও বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার হিসাবে তা প্রায় এক হাজার একর। পুলিশ ও জেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, জঙ্গল সলিমপুরে অন্তত ৩০টি পাহাড় কেটে প্লট করা হয়েছে এবং প্রায় ২৬ হাজার ছোট প্লটের ২৩ হাজারই বিক্রি হয়েছে। এসব অবৈধ প্লট বাণিজ্য ও সেবা-বাণিজ্যের মাধ্যমে গড়ে ওঠা দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো ভাঙাই এখন প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

শেয়ার করুন