১৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিরিয়ার বর্তমান সংকট: আসাদ-উত্তর পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার লড়াই

প্রকাশ:

প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পতনের প্রায় দুই বছর পর সিরিয়ায় নতুন করে ব্যাপক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে জ্বালানির দাম হঠাৎ সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। আসাদ পরিবারের ৫৪ বছরের শাসনামলে সরকারি নীতির যেকোনো বিরোধিতা মানেই ছিল কারাবন্দি হওয়া, নির্যাতন, গুম বা মৃত্যুর ঝুঁকি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বিক্ষোভকারীদের বাড়ি ফিরে যেতে দেওয়া হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও এসব বিক্ষোভের খবর প্রচার করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। অতীতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এসব বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র বা কাতারের স্টুডিও থেকে সাজানো নাটক হিসেবে প্রচার করত। আসাদ পরিবারের ৫৪ বছরের পুলিশি শাসনের সময় প্রকাশ্যে সরকারের বিরোধিতা করার অর্থ হতে পারত কারাবন্দি হওয়া, নির্যাতন, গুম কিংবা মৃত্যু। সম্প্রতি সরকারের হঠাৎ জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ শুরু হয়। তখন রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিক্ষোভকারীদের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে নানা ধরনের অপপ্রচার চালাত। আর এই পরিস্থিতিতে অনেক নাগরিকের ধৈর্য ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রদেশে বিক্ষোভের কথা উঠে এসেছে।

নতুন সরকারের কাছে বর্তমান পরিস্থিতি এক বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের আশা—এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে। জ্বালানি সংকটের কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধের প্রভাবকে দায়ী করেছে সরকার। তবে তীব্র সমালোচনার মুখে কিছু মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় প্রশাসন। জ্বালানিমন্ত্রীকে সংসদে পাঠিয়ে জবাবদিহিতার বিষয়টি সামনে এনে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের এই ইতিবাচক সাড়া সত্ত্বেও জীবনযাত্রার মৌলিক ব্যয়সংকট দূর হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সিরিয়ার দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বর্তমানে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে দিনযাপন করছেন, যেখানে তাদের দৈনিক আয় ৩ দশমিক ৬৫ ডলারেরও কম। তবে তারা সতর্ক করেছেন, এতে দেশটির জীবনযাত্রার ব্যয়সংকটের মৌলিক সমস্যাগুলোর পরিবর্তন হবে না।

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের ‘সিরিয়া ইন ট্রানজিশন ল্যাব’-এর পরিচালক ইব্রাহিম আল-আসিল মনে করেন, অর্থনৈতিক সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধান না করলে ভবিষ্যতে এমন বিক্ষোভ আরও ঘটবে। এছাড়া ওয়াশিংটন ডিসির ‘মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট’-এর সিরিয়া ইনিশিয়েটিভ পরিচালক চার্লস লিস্টার জানান, নতুন সরকারের জন্য ‘হানিমুন পর্ব’ শেষ হওয়াটা অবশ্যম্ভাবী ছিল। মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলে অস্থিরতা বাড়বেই। দেশটিকে পুনর্গঠন করতে প্রায় ২১৬ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন বলে বিশ্বব্যাংকের হিসাব রয়েছে। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এমন একটি রাষ্ট্র পেয়েছেন যা দীর্ঘদিনের লুটপাটের ফলে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। সিরীয়রা যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তা কাটিয়ে ওঠা প্রায় অসম্ভব।

আন্তর্জাতিক মহলে সিরিয়ার অবস্থান পুনরায় শক্তিশালী করার কৌশলে কাজ করছেন আল-শারা। গত বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তিনি জানান, সিরিয়া বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যে তার মর্যাদা ফিরে পেয়েছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কেন্দ্রে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার কূটনৈতিক সাফল্যের বড় নিদর্শন হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা। গত মে মাস থেকে এ পর্যন্ত ট্রাম্পের সঙ্গে চারবার বৈঠক করেছেন আল-শারা। এই সম্পর্কের জেরে সিরিয়ার ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা বিদেশি বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করেছে।

এখন পর্যন্ত সিরিয়ায় বিনিয়োগকারী দেশগুলোর তালিকায় এগিয়ে রয়েছে তুরস্ক, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব দেশ থেকে সিরিয়ায় প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে। এই বিদেশি বিনিয়োগের ওপর ভর করেই বর্তমান সরকারকে ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হচ্ছে, যা তাদের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

শেয়ার করুন