২৩ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ বছরে নিঃস্ব তিন শতাধিক পরিবার

প্রকাশ:

সড়ক দুর্ঘটনার নিষ্ঠুর বাস্তবতায় গত ৬ বছর ১০ মাসে প্রায় ৩০০ পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ২০২০ সালের ৪ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জের দৌলতপুর উপজেলার মূলকান্দি এলাকায় এমন এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের পাঁচজন প্রাণ হারান। টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার চাষাভদ্রা গ্রামের এই পরিবারটি তখন এমন এক মানবিক সংকটে পড়েছিল যে, নিহতদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার মতো নিকটাত্মীয় খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছিল। স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর সহায়তায় শেষ পর্যন্ত তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। স্বজনদের মৃত্যুতে শোক করার মতো মানুষও যখন আর অবশিষ্ট থাকে না, তখন সেই শোকের সঙ্গে যুক্ত হয় এক কঠিন মানবিক সংকট। খাটিয়াগুলোর চারপাশে তখনো থামছে না স্বজনদের কান্না আর প্রতিবেশীদের দীর্ঘশ্বাস।

নিহত সেই পাঁচজন হলেন হরেকৃষ্ণ বাদ্যকর (৫৫), তাঁর ছেলে গোবিন্দ বাদ্যকর (২৮), পুত্রবধূ ববিতা বাদ্যকর (২৫), নাতনি রাধে বাদ্যকর (৪) এবং তাঁর চাচাতো ভাই রামপ্রসাদ বাদ্যকর (৩০)। কেবল এই একটি পরিবারই নয়, বরং সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যুর ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে কাজে বা বেড়াতে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ায় একটি দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তবে শুধু একসঙ্গে যাতায়াতকে দায়ী করার সুযোগ নেই। যানবাহন ও সড়ক ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতাও এ ধরনের প্রাণহানির পেছনে ভূমিকা রাখছে। ফলে এই সংখ্যাকে পূর্ণাঙ্গ বা চূড়ান্ত পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও বাসের মতো যানবাহনে যাতায়াতের সময় একই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান অথবা ভাইবোনসহ একাধিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। আগের দিনও এই মাঠে তাঁরা হাসি–আনন্দে সময় কাটিয়েছেন শিক্ষার্থী ও সহকর্মী শিক্ষকদের সঙ্গে।

সর্বশেষ গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে জামালপুর–দেওয়ানগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের মেলান্দহ উপজেলার নয়ানগর ইউনিয়নের বুরুঙ্গা এলাকায় দ্রুতগতির ট্রাকের চাপায় একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দুমড়েমুচড়ে যায়। এক দিনের ব্যবধানে সেখানে চলছে শেষবিদায়ের প্রস্তুতি।

এতে ইসলামপুর উপজেলার ইন্দুল্লামারী এলাকার শিক্ষক মোরশেদ আলম (২৪), তাঁর স্ত্রী ইকরামা (১৯) ও তাদের সাত মাস বয়সী শিশুকন্যা রিফা ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এক শিক্ষক দম্পতির জন্য খাটিয়া দুটি রাখা হয়েছে। মাঠের এক কোণে এ দম্পতি ও তাঁদের সাত মাস বয়সী একমাত্র কন্যাসন্তানের শেষ গোসল দেওয়া হচ্ছিল। দৌলতপুরের মূলকান্দিতে পাঁচজনের মৃত্যু কিংবা জামালপুরের মেলান্দহে শিক্ষক দম্পতি ও তাঁদের শিশুকন্যার প্রাণহানি—এমন ঘটনাগুলো মনে করিয়ে দেয়, সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতি শুধু নিহত মানুষের সংখ্যায় পরিমাপ করা যায় না। এই দম্পতি মাহমুদপুর হারুনুর রশিদ ইসলামী কমপ্লেক্সের শিক্ষক ছিলেন।

এ দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল চালক লিখন আকন্দও (৩২) মারা যান। এ ছাড়া নিহত মোটরসাইকেলের চালকের নাম লিখন আকন্দ (৩২)।

পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে ইকরামার চাচা ইদ্রিস আলী শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন, কারণ তাদের পরিবারে আর কেউ অবশিষ্ট রইল না।

ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, অটোরিকশা দুর্ঘটনায় ২১১টি ঘটনায় একই পরিবারের দুজন করে সদস্য নিহত হয়েছেন। মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রে ৪৮টি এবং প্রাইভেট কারে ৩৪টি দুর্ঘটনায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনায় ১১টি ঘটনায় দুজনের মৃত্যুসহ মোট ৪৫টি দুর্ঘটনায় ১৬২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। বাস দুর্ঘটনায় ১৭টি ঘটনায় দুজন করে এবং ৯টি ঘটনায় তিনজন ও ৬টি ঘটনায় চারজন করে মোট ৮৫ জন মারা গেছেন। একটি পরিবারের একাধিক সদস্যের এমন মৃত্যুর ঘটনার প্রভাব পড়ে পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্য, স্বজন ও পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও। ফলে পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক কাঠামোও ভেঙে পড়ে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিচালক সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রায় ৩০০টি পরিবার নিশ্চিহ্ন হওয়ার হিসাব পাওয়া গেছে। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ সংস্থাটি সরাসরি দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে তথ্য যাচাই করেনি।

বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার মনে করেন, এটি আমাদের দেশের সামগ্রিক অনিয়মের প্রতিফলন। তিনি জানান, সড়কে পুরো পরিবারের নিহত হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সড়ক দুর্ঘটনা একটি জটিল ব্যাধি, কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রণে যেসব পদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে তা একমুখী এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানসম্মত নয়।

সড়কে প্রাণহানি কমাতে মোটরসাইকেল আরোহীদের মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার, ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

একইসঙ্গে মহাসড়কে রোড ডিভাইডার ও সার্ভিস রোড নির্মাণ, গ্রামীণ সড়কের সঙ্গে মহাসড়কের নিরাপদ সংযোগ নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত যানবাহনের নজরদারির সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ ও চালকদের দক্ষতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, মহাসড়কে অটোরিকশার চলাচল, অনেক মাইক্রোবাস ও অ্যাম্বুলেন্সের ফিটনেস না থাকা, এসব যানবাহনের চালকদের অদক্ষতা ও বিশ্রাম ছাড়া দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

শেয়ার করুন