১১ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংবিধান সংশোধনী কমিটি: সরকারের উদ্যোগে সাড়া দিচ্ছে না বিরোধীরা

প্রকাশ:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষে সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করেছে বর্তমান সরকার। তবে এই প্রক্রিয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের মতপার্থক্য। সরকার সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করলেও, বিরোধী দলগুলো এতে কোনো প্রতিনিধি পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের দাবি, নির্বাচনের দিন গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তার আলোকে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করে সংস্কার কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে। সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংশোধন প্রক্রিয়াকে বিরোধী নেতারা গণভোটের রায়ের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। দলটির সংসদ সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথও নেননি। কমিটি নিয়ে মুখোমুখি সরকার-বিরোধী দল: এর আগে গত ২৯শে এপ্রিল বিএনপি ১৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল।

গত ১৬ই জুন সংসদের এলডি হলে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট ঘোষণা করেন যে, সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটিতে তারা কোনো প্রতিনিধি দেবেন না। জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবিতেই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাই সরকার যদি সংবিধান সংশোধন নয়, বরং প্রকৃত সংস্কারের জন্য কোনো পরিষদ গঠন করে, তবেই তারা বিষয়টি বিবেচনার সুযোগ রাখবেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকেও এ কমিটিতে কোনো প্রতিনিধি পাঠানো হয়নি। কমিটিতে বিরোধী দল থেকে পাঁচজন প্রতনিধির নাম চাওয়া হলেও তারা নাম দেননি।

জুলাই জাতীয় সনদ (সাংবিধানিক সংস্কার) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপট বেশ দীর্ঘ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সম্মতিতে এই সনদ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৩ই নভেম্বর প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন এ সংক্রান্ত বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন। কমিশনের কাজের শেষে মোট ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে ওঠে, যার মধ্যে ৪৮টি বিষয়ে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। বাকি বিষয়গুলো আইন ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে বিএনপি মাত্র ৯টি বিষয়ে তাদের আপত্তির (নোট অব ডিসেন্ট) কথা জানিয়েছিল। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য জামায়াত সময় চেয়েছিল।

আইন অনুযায়ী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পর ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যদের নিয়ে একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের নির্দেশনা ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার তা না করে গত ১৩ই জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রথম বৈঠক ৪ঠা আগস্ট অনুষ্ঠিত হয় এবং দ্বিতীয় বৈঠকেও দলগুলোর প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে বিশেষ কমিটির এই প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা দলগুলো। ২০শে সেপ্টেম্বর আয়োজিত মতবিনিময় সভাতেও তারা অনুপস্থিত ছিল। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় ওই আদেশ অনুসারে ত্রয়োদশ সংসদের সদস্যদের নিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারকাজ শেষ করতে হবে। আইনি প্রক্রিয়া ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একটি প্রতিষ্ঠিত ও স্বাধীন রাষ্ট্রে নতুন করে সংবিধান পুনর্লিখন বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রয়োজন পড়ে না।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের মতে, জনগণের রায়ের চেয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বড় হতে পারে না। জনগণের ম্যান্ডেট পাশ কাটিয়ে অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় সংস্কার করা অগ্রহণযোগ্য। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের যোগ করেন, দীর্ঘদিন আলোচনার পর যে ঐকমত্য হয়েছিল, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ তার পক্ষে রায় দিয়েছেন। অথচ সেই রায়কে কার্যকর না করে নতুন করে সংশোধন কমিটি গঠন ভিত্তিহীন ও অকার্যকর একটি উদ্যোগ। জনগণের ভোট কোনো রাজনৈতিক দলের সুবিধা-অসুবিধা কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠতা-সংখ্যালঘিষ্ঠতার ভিত্তিতে গ্রহণ বা বর্জনের বিষয় নয়।

এনসিপি’র মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার প্রশ্ন তোলেন, কেন সরকার পূর্বনির্ধারিত সংস্কার পরিষদ গঠন না করে নতুন এই পথে হাঁটছে? তার মতে, এ ধরনের একচেটিয়া প্রক্রিয়ার কোনো নৈতিক বৈধতা নেই। সরকার এককভাবে কাজ সম্পন্ন করলেও এর পরিণাম ও দায় তাদেরই বহন করতে হবে। তারা গণভোটের রায়ের অবমাননা করছেন বলে তিনি মনে করেন। এদিকে বামপন্থী চারটি দল এবং সংস্কারের দাবিতে অনড় থাকা খেলাফত মজলিসসহ আরও কয়েকটি দলও এই কমিটির সাথে দূরত্ব বজায় রাখছে। সরকার অবশ্য দাবি করছে, সংসদীয় ব্যবস্থার নিয়মে সংশোধনী গৃহীত হওয়াই এক ধরনের সংস্কার এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই তারা চূড়ান্ত রিপোর্ট সংসদে পেশ করবে।

শেয়ার করুন