কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে অব্যবহৃত জমিতে ৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরো প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৪ কোটি ৯৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা। কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ইতিমধ্যে তাদের প্রস্তুত করা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) বিবেচনার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নজমুল হক।
সিপিজিসিবিএল সূত্র জানায়, মাতারবাড়ীতে নির্মিত ২ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানায় ছাই সংরক্ষণের জন্য শুরুতে প্রায় ৬৩০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবে কেবল ১০৫ একর জমিতে ছাইয়ের পুকুর তৈরি করা হয় এবং বাকি ৫২৫ একর জমি অব্যবহৃত থেকে যায়। সেখান থেকেই ১৭১ একর জমিতে এই নতুন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হবে। ছাইয়ের পুকুর ঘিরে আগেই ১৪ মিটার উঁচু বাঁধ থাকায় নতুন করে জমি অধিগ্রহণ বা প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দরকার হবে না। এতে জমি ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে। এ ছাড়া ছাইয়ের পুকুরের চারপাশে বিদ্যমান ১৪ মিটার উঁচু বাঁধ থাকায় নতুন করে সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণেরও প্রয়োজন হবে না বলে প্রকল্পের বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের প্রস্তাবিত অর্থায়ন কাঠামো অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৪২ কোটি ৮৭ লাখ ৬ হাজার টাকা এবং প্রকল্প ঋণ হিসেবে ৫৩২ কোটি ৩৯ লাখ ১২ হাজার টাকা মেটানো হবে। এ জমির একটি অংশে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপন করা হবে।
এছাড়া বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান সিপিজিসিবিএল তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে ২৯ কোটি ৭১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা সংস্থান করবে। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সুবিধা কাঠামোর অধীনে এ প্রকল্পে ঋণ দেবে। ইআইবির এই অর্থনৈতিক সহায়তার মধ্যে ৩৫ কোটি ইউরো ঋণ ও ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো অনুদান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বৈদেশিক ঋণ নিশ্চিতে প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকারি ইশতেহার ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি-৭) সাশ্রয়ী ও আধুনিক জ্বালানি সুসংহত করার উদ্দেশ্যে এটি গ্রহণ করা হয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছে হওয়ায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সহজে পরিবহন করা সম্ভব হবে। প্রাথমিকভাবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়া সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ৫০ মেগাওয়াটের প্রস্তাব করা হলেও পরবর্তীতে উৎপাদন লক্ষ্য বাড়িয়ে ৭০ মেগাওয়াট করার সুপারিশ আসে। প্রকল্প বাস্তবায়নে সৌর পিভি মডিউল ও ইনভার্টার বসানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা হবে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের আশা, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে আমদানি করা সরঞ্জাম দ্রুত খালাস ও পরিবহন করা সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যের উদ্দেশ্য সবার জন্য সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, টেকসই ও আধুনিক জ্বালানির সুযোগ নিশ্চিত করা।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্দেশ্যে নিকটবর্তী মাতারবাড়ী ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রে সংযোগ দিতে ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৩২ কেভি ওভারহেড সঞ্চালন লাইন এবং মাতারবাড়ী ও চকরিয়া উপকেন্দ্রে ১৭.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দ্বিতীয় সার্কিট ওভারহেড কন্ডাক্টর নির্মাণ করা হবে। একই সাথে মাতারবাড়ীতে তিনটি এবং চকরিয়ায় একটিসহ মোট চারটি ১৩২ কেভি এয়ার ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার (এআইএস) বে তৈরি করা হবে। এর ফলে তৈরি হওয়া বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে যুক্ত হতে পারবে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির প্রভাব কমিয়ে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে।
পরিকল্পনা কমিশনের বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম প্রধান মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম জানান, দ্রুতই ডিপিপি নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হবে। তবে প্রস্তাবটির চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে অন্যান্য একই ধরনের প্রকল্পের সাথে প্রধান সরঞ্জামের দর তুলনা, সৌর মডিউল ও ইনভার্টারের বাজারদর যাচাই এবং অর্থ বিভাগের পূর্বানুমোদন নেওয়া। একই সাথে বাস্তবায়নে সিপিজিসিবিএলের নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কারণ মোট বাজেটের মাত্র ৪.৯১ শতাংশ তারা নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। এ ক্ষেত্রে সংস্থা ও অবস্থানভিত্তিক তথ্য দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।
কমিশন আরও জানিয়েছে, প্রাক্কলিত কেনাকাটায় যানবাহন, আসবাবপত্র ও অফিস সরঞ্জাম বাবদ ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার যে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে এবং কতটি মোটরসাইকেল কেনা হবে, পিইসি সভায় সেসবের যৌক্তিকতা কঠোরভাবে পরখ করা হবে। পাশাপাশি পরিকল্পনা কমিশন দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা এবং সংস্থা ভিত্তিক বর্তমান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট উপাত্ত দিতে সিপিজিসিবিএলকে নির্দেশনা দিয়েছে। যানবাহন, অফিস সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র কেনার জন্য ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের যৌক্তিকতা এবং মোটরসাইকেলের সংখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখের বিষয়টিও পরীক্ষা করা হবে।
বর্তমানে দেশে ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য উৎসসহ মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে ৩২ হাজার ৬৮৮ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মাত্র ১ হাজার ৯৩৪.৫৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৫.৯১ শতাংশ। সরকারের নতুন নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ সবুজ শক্তি থেকে পূরণের লক্ষ্য রয়েছে। মাতারবাড়ীর এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নবায়নযোগ্য শক্তির সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণে বড় ধরনের অগ্রগতি হবে। তাঁর ভাষ্য, প্রকল্পটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখবে।





