৬ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় ৫ মাসে বিশ্ববাজারে তেলের সর্বোচ্চ দাম

প্রকাশ:

সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা এবং হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন এলাকায় তেলবাহী জাহাজে আঘাত হানার জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্ববাজারে তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলারে ঠেকেছে, যা গত ১৮ মে’র পর সর্বোচ্চ।

মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বুধবারের কিছু সামরিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে। এদিন ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ একাধিক স্থানে হামলা চালায়। এর মধ্যে দাম্মামের একটি বেসামরিক বিমানবন্দরে হওয়া হামলায় দুজন নিহত ও আটজন আহত হন। পাশাপাশি দেশটির একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় আরও দুজন প্রাণ হারিয়েছেন।

একই সময়ে উত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলে অভিযান চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘অবৈধ’ তেল স্থানান্তরের অভিযোগে বুধবার চারটি জাহাজে আঘাত হানা হলে সেগুলোতে আগুন ধরে যায়। ইরানি বাহিনী জাহাজগুলোকে অনুসরণের পর এ ঘটনা ঘটে বলে দাবি করা হয়। এছাড়া আইআরজিসি আরও জানায়, হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে তিনটি জাহাজ মাইনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, উসকানি অব্যাহত থাকলে এ অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর আরও বড় ধরনের হামলা চালানো হতে পারে।

নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কৌশলগত পদক্ষেপে জোর দিচ্ছে ওয়াশিংটন। সৌদি আরবে অবস্থিত বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন থেকে কিছু কূটনীতিক ও তাঁদের পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরও বেশ কিছু মিশন থেকেও পরিবারদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা আরামকো তাদের ধাহরান সদর দপ্তরের কর্মীদের সরিয়ে নিয়ে দূর থেকে বা অনলাইনে কাজের নির্দেশ জারি করেছে।

অঞ্চলটিতে সামরিক সংঘাত ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে, যা বৈশ্বিক বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। প্রায় আট মাস আগে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যত অবরোধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, এটি ইতিহাসের অন্যতম চরম সরবরাহ সংকট তৈরি করতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর প্রাথমিক সপ্তাহগুলোতে তেলের দাম ১০০ ডলার পার হয়ে যায় এবং হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দাম ১৫০ ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।

সংঘাতের আবর্তে গত এপ্রিলে তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে উঠেছিল।

পরবর্তীতে মে মাসের শেষে তা ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে এবং জুলাইয়ের শুরুতে যুদ্ধবিরতির আশায় কমে ৭১ ডলারে দাঁড়ায়। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সমঝোতা ভেস্তে যাওয়ায় এবং নতুন করে সহিংসতা শুরু হওয়ায় তেলের বাজার আবারও উর্ধ্বমুখী। তবে জ্বালানি তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, লোহিত সাগর ও ওমান উপসাগরের দিকে স্থলপথে পাইপলাইনে পরিবহন বাড়ানোর কারণে পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানি বর্তমানে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

জ্বালানি সংকটের এই প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এশিয়ার শেয়ারবাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। বৃহস্পতিবার জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ২ দশমিক ৭ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ৩ শতাংশ কমেছে। এর পাশাপাশি জ্বালানি খাতে অস্বাভাবিক পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাসমূহ চলতি বছর বড় অঙ্কের লোকসানের আশঙ্কা করছে এবং পূর্বের লাভের পূর্বাভাস থেকে সরে এসেছে। এর আগে চলতি বছরে মুনাফা অর্জনের যে পূর্বাভাস দিয়েছিল, তা থেকে সরে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি।

শেয়ার করুন