কাগজে-কলমে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় প্রথমবারের মতো ৩ হাজার ২০ ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু বাজারের নিত্যপণ্যের দাম মেটাতে হিমশিম খাওয়া সাধারণ মানুষ কিংবা শ্রমজীবী শ্রেণির কাছে এই পরিসংখ্যানের কোনো বাস্তবিক গুরুত্ব নেই। বরং আয়ের চেয়ে ব্যয় বৃদ্ধির হার বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনে অস্থিরতা বাড়ছে। তাঁরা কষছেন অন্য হিসাব—আয় যতটুকু বাড়ছে, খরচ বাড়ছে তার চেয়ে দ্রুত। খেটে খাওয়া মানুষ সেই ধাক্কা সামলান পাত ছোট করে, সঞ্চয় ভেঙে, ধারদেনা করে। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের তিনটি মানদণ্ড—মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক পূরণ করে।
বিবিএস-এর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ২০ ডলার হলেও এর পেছনে থাকা ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা এখন সংশোধিত হিসাবে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশের ঘরেই থমকে থাকতে পারে। গড় আয়ের এই বৃদ্ধি যে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে, তার বড় প্রমাণ দারিদ্র্যের হার। এ যেন এক উল্টোপাল্টা খেলা—মাথাপিছু আয় বাড়ে, অথচ দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বাড়ে; প্রবৃদ্ধি থমকে যায়, অথচ রাষ্ট্রের ঋণ থামে না। পাশাপাশি ক্রমাগত ভারী হচ্ছে রাষ্ট্রের ঋণও। ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি যে কারণে অবাস্তব নয়।
২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২২ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছিল। তবে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, টানা চার বছর বেড়ে ২০২৬ সালে দারিদ্র্যের হার ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শুধু গত অর্থবছরেই আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী দৈনিক ৩ ডলারের নিচে আয় করা মানুষের সংখ্যা ২১ লাখ বেড়েছে। অথচ দেশের ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ এখনো কোনো ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাইরে রয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ ও অকটেন ১৬৫ টাকা-দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
দারিদ্র্য বাড়ার পেছনে বেকারত্ব একটি বড় কারণ। বিবিএস-এর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে ২০ লাখ ৩২ হাজারই তরুণ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ প্রতি চারজন বেকারের তিনজনই তরুণ এবং উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। একই সময়ে নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক দশকের অর্জন আমরা মাত্র চার বছরে অনেকটাই হারাতে বসেছি।
শিল্প খাতেও অস্থিরতা কাটছে না। শিল্প পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে ৪৫৭টি শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যার মধ্যে ১৭০টি বস্ত্র ও পোশাক খাতের। উদ্যোক্তাদের হিসেবে এ সংখ্যা পাঁচ শতাধিক ছাড়িয়েছে এবং শুধু পোশাক খাতেই প্রায় দেড় লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। বন্ধ কারখানা সচল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক মে মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও কাজের সংকট কাটেনি। কাজের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দামের চাপ। তবে অর্থনীতির গভীরতম ক্ষতটি ব্যাংক খাতে।
দামের চাপে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ হলেও মজুরি বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। এর ওপর জ্বালানি তেলের দামের প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে হু হু করে। সাত মাসে সরকার তিন দফা জ্বালানির দাম সমন্বয় করেছে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, মার্চের তুলনায় আগস্ট পর্যন্ত তাদের লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। সরকারের যুক্তি, বিশ্ববাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও দেশে পুরো সমন্বয় করা হয়নি; তারপরও মার্চ-আগস্টে বিপিসির লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি আরও নাজুক। জুন ২০২৬ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। বিপুল এই অর্থ আটকে থাকায় নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, সরকারি ঋণের বোঝা বাড়ছে। ২০২৪ সালের জুনে সরকারের মোট ঋণ ছিল ১৮ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা, যা অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ব্যাংক খাত থেকে নিট ঋণ নেওয়া হয়েছে প্রায় ৭৯ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সরকারের দায় এখন প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যার বিপরীতে চলতি বাজেটে সুদ পরিশোধের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে, আর জিডিপি প্রবৃদ্ধি নামতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশে। জুনে বিদ্যুতের খুচরা দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়ে ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৬৩ পয়সা হয়েছে; অক্টোবরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দামও বেড়েছে। আইএমএফের ৫৫০ কোটি ডলারের কর্মসূচি থেকে পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার এসেছে।
আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষি চললেও প্রবৃদ্ধির এই বন্ধুর পথে এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা থাকলেও সিডিপি সময় বাড়িয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত করেছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি, কিন্তু সেখানে গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশের মতো কাঠামোগত দুর্বলতা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, কার্যাদেশ কমে যাওয়া, ঋণ ও এলসির জটিলতা আর শ্রম অসন্তোষের কারণ বহুমুখী। কিন্তু জ্বালানির বাড়তি খরচ সেচ আর পরিবহন হয়ে শেষ পর্যন্ত গিয়ে বসে চাল, ডাল, সবজি আর মাছের দামে। শর্ত নিয়ে দর-কষাকষি যেকোনো দেশের সার্বভৌম অধিকার, সেই চর্চাই এখন চলছে। সরকারের অনুরোধে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে সাধারণ পরিষদের চলতি অধিবেশনে। ২০২১ সালে দ্বিতীয়বার মানদণ্ড পূরণের পর সিডিপি উত্তরণের সুপারিশ করে। তবে করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে সাধারণ তিন বছরের বদলে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল দিয়ে ২০২৬ সালকে উত্তরণের সময় নির্ধারণ করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়তি সময় পাওয়া স্বস্তির, কিন্তু সময়ই সমাধান নয়।
প্রতিবেশী দেশ ভারত যেখানে সংকট সত্ত্বেও চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে এবং মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৪ শতাংশের আশেপাশে রেখেছে, সেখানে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন করে নগদ সহায়তা দিলে প্রায় সাড়ে ২৮ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার উপরে তোলা সম্ভব বলে বিশ্বব্যাংক মনে করে। কিন্তু কেবল পরিকল্পনা নয়, প্রয়োজন সাহসী পদক্ষেপ এবং সাধারণ মানুষের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করার মতো প্রকৃত উন্নয়ন নীতি। এ অবস্থায় উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক একটি বড় প্রশ্ন।





