৪ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রধানমন্ত্রী |: স্বৈরাচারের ফেরার পথ খুললে জুলাই শহীদদের সঙ্গে

প্রকাশ:

স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তন প্রতিরোধে জাতীয় ঐক্যের ডাক

স্বৈরাচারী রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাবর্তনের সুযোগ তৈরি হলে তা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি চরম গাদ্দারি হবে বলে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজনৈতিক দলগুলোকে গঠনমূলক সমালোচনা ও বিরোধিতার চর্চা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থ ও মৌলিক বিষয়গুলোতে দেশের সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখতে হবে। সোমবার রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ওসমানী উদ্যানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মরণে নবনির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ এবং উদ্যানের শুভ উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে আজ সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। এ সময় তিনি উদ্যানসংলগ্ন গ্রন্থাগারও পরিদর্শন করেন। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেন।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন, সাধারণ মানুষের দেওয়া সরাসরি রায়ে বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার লাভ করেছে, ঠিক তেমনি অন্য দলগুলো তাদের প্রাপ্ত ভোটে বিরোধী দলের আসনে আসীন হয়েছে। সংসদে এবং সংসদের বাইরে রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনগণের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করাই সব রাজনৈতিক দলের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। বর্তমান প্রশাসন সর্বতোভাবে দেশের মানুষের সামগ্রিক ভাগ্যের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি দল মানেই জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না, আর বিরোধী দলই শুধু জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে-এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলেও তা যথাযথভাবে পালনে নাগরিকদের সহযোগিতা প্রয়োজন।

গণতন্ত্রের বিকাশ ও জুলাই বিপ্লবের চেতনা

বিরোধী দলগুলোর নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান স্মৃতিচারণ করেন যে, জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ও প্রাণদানকারী শহীদ পরিবারের সদস্যদের শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে আয়োজিত সরকারি কার্যক্রমে তাঁদের উপস্থিত থাকতে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দূরত্ব বা মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও আহত যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়ে কোনো দ্বিধা থাকা উচিত নয় বলে তিনি মতামত প্রকাশ করেন।

তারেক রহমান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, জুলাইয়ের বীর শহীদ ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে আহতদের অসীম আত্মত্যাগের বিনিময়েই আজ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অনেকে সুপরিচিতি ও অবস্থান লাভ করেছেন। তাই তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা প্রতিটি নাগরিক ও রাজনৈতিক দলের নৈতিক দায়িত্ব। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্তর্নিহিত চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করার প্রকৃত অর্থ হলো আত্মদানকারীদের পরিবারের পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেওয়া এবং তাঁদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া।

ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও জাতীয় ঐক্য

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পুনপ্রবর্তন করেছিলেন। দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিক চর্চা অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব মতভেদ থাকলেও দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাঁরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, যেখানে মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করবে, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারবে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবে।

গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সবার শতভাগ একমত না হওয়াটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক বলে মত ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তবে শিক্ষা, সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান, সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নাগরিক স্বাধীনতা, আধুনিক চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং আগামী প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার মতো মৌলিক জাতীয় বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে সবার ঐকমত্যে পৌঁছানোর যথেষ্ট সুযোগ ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

সংসদে আলোচনা ও সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গ

রাষ্ট্রীয় আইন ও সংবিধান সম্পর্কিত বিষয় তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সংবিধান সংশোধন ও সার্বিক রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভিন্ন ভিন্ন দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি, নিজস্ব মতামত এবং রাজনৈতিক অবস্থান থাকাটা স্বাভাবিক। নাগরিকরা এসব বিষয়ে যৌক্তিক তর্ক-বিতর্ক ও গঠনমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যই তাঁদের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত করে সংসদে পাঠিয়েছেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বা রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে সংসদীয় গণতন্ত্রের নিয়ম মেনে জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে। যুক্তি ও গ্রহণযোগ্য মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে সাধারণ মেহনতি মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও রুটি-রুজির সংগ্রাম কোনো বাধা ছাড়াই সুচারুভাবে পরিচালিত হতে পারবে। স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে লেজার কাটিংয়ের মাধ্যমে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি পাঁচটি নতুন জলাশয় নির্মাণ করা হয়েছে।

ওসমানী উদ্যান আধুনিকায়ন ও পরিবেশ রক্ষা

ওসমানী উদ্যানের নতুন সংস্কার প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি এবং দেশের সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের স্বার্থে বিভিন্ন নতুন স্থাপনা অবশ্যই তৈরি করতে হবে। তবে যেকোনো ভৌত অবকাঠামো এবং বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় প্রকৃতির ক্ষতি যত দূর সম্ভব ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, নতুন উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি আমাদের বিদ্যমান গাছপালা এবং সামগ্রিক প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা আবশ্যক। আগামীতে যেকোনো স্থাপত্য নকশা ও সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভবিষ্যতে স্থাপত্য ও অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও প্রকৃতিকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।

জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ওপর তাগিদ

সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসাপাতাল এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসভবন সরেজমিনে পরিদর্শনের স্মৃতি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা প্রাঙ্গণগুলোতে সর্বাত্মক পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন। বিশেষ করে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে চিকিৎসা সেবার মান বৃদ্ধি এবং সার্বিক স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা অপরিহার্য। রোগীরা যাতে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে সঠিক চিকিৎসা পেতে পারেন, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বরত চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ সচেতন থাকার নির্দেশ দেন তিনি।

একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের বাসস্থান পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দিয়ে তারেক রহমান বলেন, যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনা এবং সরকারি নীতি বাস্তবায়নের মূল দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন, তাঁদের নিজেদের দৈনন্দিন আচরণেও পরিচ্ছন্নতা ও সুস্থ পরিবেশের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও পার্কের বিস্তারিত স্থাপত্য

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ওসমানী উদ্যানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বীর স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে নির্মিত হয়েছে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। এই স্মারক প্রাঙ্গণের একদম সামনে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীকী সমাধিফলক। স্মৃতিস্তম্ভটির বহিরাংশে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৪ ফুট উঁচু এবং ভিতরের অংশে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৭ ফুট উচ্চতার রিলিফ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে, যা আগতদের ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে নির্মিত ৯০ ফুট উঁচু স্মৃতিস্তম্ভটি প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত।

  • উক্ত রিলিফ ভাস্কর্যসমূহে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের তীব্র গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
  • পুরান ও নতুন ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক ২৩ একর আয়তনের ওসমানী উদ্যানটিকে আধুনিক নান্দনিক নকশায় সাজানো হয়েছে।
  • পার্কে দর্শনার্থী ও ব্যায়ামপ্রার্থীদের জন্য রয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পরিকল্পিত হাঁটার পথ, বিশ্বমানের ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণ-শৌচাগার, আধুনিক পার্কিং ব্যবস্থা এবং সুবিশাল জলাশয়ের সুবিন্যস্ত ঘাট।
  • পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা হিসেবে উদ্যানে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য বিশেষ ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার রিজার্ভার নির্মাণ করা হয়েছে।
  • দুই স্তরে নান্দনিকভাবে সাজানো এই উদ্যানে মূল সড়ক থেকে সরাসরি প্রবেশের জন্য দুটি আধুনিক ফুটওভার ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে শীর্ষ মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের উপস্থিতি

উদ্বোধনী এই মহাসমারোহে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ। উপস্থিত শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও মন্ত্রীরা উদ্যান এলাকা ঘুরে দেখেন এবং জুলাই স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

শেয়ার করুন