পাপুয়া নিউগিনিতে উদ্ধার হওয়া চীনের তৈরি একটি সন্দেহজনক বস্তুকে কেন্দ্র করে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রাজধানী পোর্ট মোরেসবির একটি নির্মাণাধীন স্থানে গত সপ্তাহে ৩২ কেজি ওজনের বিশালাকার একটি বস্তু পাওয়া যায়। এ ঘটনার জেরে চার চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করে স্থানীয় পুলিশ। এরপর থেকেই বস্তুটি আসলে কী, তা নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। চীনা সরকারের মিথ্যা বলার দক্ষতা আরও বাড়ানো উচিত, এটি একদম কাঁচা হাতের কাজ হয়েছে।’।
পোর্ট মোরেসবিতে অবস্থিত চীনা দূতাবাস ফেসবুকের মাধ্যমে দাবি করেছে, গোলার মতো দেখতে বস্তুটি আসলে একটি ‘নিরীহ মদের বোতল’। আরেকজন লিখেছেন, ‘আমার জীবনে দেখা এটিই সবচেয়ে বেশি বিস্ফোরক মদের বোতল।
দূতাবাস কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি কোনোভাবেই বিপজ্জনক নয়। একই সঙ্গে তারা জানায়, চীন বিশ্বের কঠোরতম আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসরণ করে, তাই কোনো সামরিক গ্রেডের গোলা পাচার হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে তারা স্থানীয় পুলিশকে তদন্তে সহযোগিতা করছে এবং চূড়ান্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তবে চীনের এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কড়া বিবৃতি দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন জানায়, সংগৃহীত তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে উদ্ধার হওয়া বস্তুটি কোনো মদের বোতল নয়, বরং এটি একটি অবিস্ফোরিত শক্তিশালী কামানের গোলা। মার্কিন দূতাবাসের ভাষ্যমতে, এটি জননিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং পাপুয়া নিউগিনির জনগণের সঠিক তথ্য পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এবিসির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বস্তুটি বেইজিংয়ের তৈরি ১৩০ মিলিমিটারের ‘টাইপ ৫৯’ মডেলের কামানের গোলা, যার ভেতরে রাসায়নিক বিস্ফোরক ও ফিউজ রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সরবরাহকৃত এক্স-রে মেশিনের মাধ্যমে স্থানীয় পুলিশ বস্তুটি পরীক্ষা করে এর সত্যতা নিশ্চিত করেছে বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট সহায়তা করছে বলেও জানানো হয়েছে। তবে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এবিসির প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে।
পাপুয়া নিউগিনির নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ওয়াশিংটন সব সময় পাশে থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চীনের ‘মদের বোতল’ তত্ত্বটি ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। নেটিজেনরা ব্যঙ্গ করে লিখছেন, ৩২ কেজি ওজনের মদের বোতল পৃথিবীর কোথাও নেই এবং চীনের সরকারি ভাষ্যটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। অনেকে এটিকে দেশের মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার মতো একটি কৌশল বলে সমালোচনা করেছেন। ফেসবুকে একজন মন্তব্য করেছেন, ‘৩২ কেজি ওজনের মদের বোতল দুনিয়াতে আর কোথায় আছে?’।
এই বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুঙ্গে। যদিও গত মাসে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দাবি করেছিলেন, এই অঞ্চলের দেশগুলোর সাথে তাদের সম্পর্ক পারস্পরিক সহযোগিতা ও ‘দক্ষিণ-দক্ষিণ’ মৈত্রীর অংশ। এটি মূলত পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ‘দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা’।
উল্লেখ্য যে, গত সেপ্টেম্বর মাসে চীন ও পাপুয়া নিউগিনি কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপন করেছে। এর কয়েক মাস আগে পাপুয়া নিউগিনি তাইওয়ানে অবস্থিত তাদের অর্থনৈতিক কার্যালয় বন্ধ করে দেয়, যার প্রশংসা করেছিল বেইজিং। চীন স্বশাসিত তাইওয়ানকে নিজস্ব ভূখণ্ড মনে করে এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিয়ে আসছে। এই কূটনৈতিক সমীকরণের মধ্যেই এখন কামানের গোলার ঘটনাটি নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ পদক্ষেপের প্রশংসা করে বেইজিং জানিয়েছিল, তারা দেশটির সঙ্গে একে অপরের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে পাশে থাকতে প্রস্তুত। বেইজিং স্বশাসিত তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড মনে করে এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হলেও একে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে।





