২৯ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিল্লির জন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা, প্রতিবাদী পরিসর সংকুচিত

প্রকাশ:

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক জন্তর মন্তরকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের নির্ধারিত স্থান হিসেবে বাতিল করেছে দিল্লি পুলিশ। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক আন্দোলন, শ্রমিকের দাবি, দুর্নীতিবিরোধী প্রচার এবং নাগরিক অধিকার আদায়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল এই স্থানটি। সোমবার দিল্লি পুলিশের জারি করা এক আদেশে জন্তর মন্তরকে অনুমোদিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অধিকারকর্মীরা, তাদের আশঙ্কা এর ফলে ভারতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ আরো সীমিত হয়ে পড়বে।

জন্তর মন্তরকে কেন্দ্র করে এই কড়াকড়ি এমন এক সময়ে এলো, যখন ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক তুঙ্গে। এই প্রক্রিয়ায় বহু যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় তরুণদের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। অনলাইনে সংগঠিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) সহ বিভিন্ন সংগঠন এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। জুলাই মাসে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তারও কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই জন্তর মন্তর, যার জেরে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও জন্তর মন্তরকে কেন্দ্র করে জোরালো হয়েছিল। এরপর থেকে শ্রমিক সংগঠন, অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য, দুর্নীতিবিরোধী কর্মী, নারী অধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থীরা এখানে বিভিন্ন দাবিতে সমাবেশ করেছেন।

সম্প্রতি এই বিক্ষোভ কেন্দ্র করে কর্তৃপক্ষ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে অস্থিরতা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে স্থানটির মর্যাদা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে দিল্লি পুলিশ তাদের আদেশে এই পরিবর্তনের কোনো নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেনি। এখন থেকে দিল্লিতে বিক্ষোভ বা সমাবেশের জন্য রামলীলা ময়দান (মধ্য দিল্লি), বুরারি ময়দান (উত্তর দিল্লি) ও সিবিডি ময়দান (পূর্ব দিল্লি)—এই তিনটি বিকল্প স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো—রামলীলা ময়দান দিল্লির কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত।

কর্তৃপক্ষের দাবি, বিকল্প স্থানগুলোতে বিক্ষোভের সুযোগ বজায় রয়েছে। কিন্তু আন্দোলনকারীরা মনে করেন, শুধু নির্দিষ্ট এলাকা বরাদ্দ করলেই প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা পায় না। জন্তর মন্তর ছিল সংসদ ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের অতি নিকটে, ফলে সেখানে প্রতিবাদ জানালে তা সহজেই নীতিনির্ধারক ও সংবাদমাধ্যমের নজরে আসত। মানবাধিকারকর্মী শবনম হাশমি মন্তব্য করেছেন, শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত এই স্থানটির গুরুত্ব অপরিসীম ছিল এবং এই সিদ্ধান্ত ভিন্নমত দমনের একটি কৌশল মাত্র। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবশ্য জন্তর মন্তরে বিক্ষোভের সময় ও পরিসর নিয়ে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পরও সেই বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে।

১৮ শতকের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত জন্তর মন্তর ১৯৯৩ সাল থেকে আন্দোলনের মঞ্চ হয়ে ওঠে। ২০১১ সালে সমাজকর্মী আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এবং শক্তিশালী লোকপাল বিল প্রণয়নের দাবিতে তার অনশন দেশজুড়ে যে আলোড়ন তুলেছিল, তার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল এটি। এছাড়া কৃষকদের অধিকার, নারী মুক্তি এবং বিভিন্ন সরকারি নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই জায়গাটি সবসময় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তবে এর পাশের সড়কটি ১৯৯৩ সালে বিক্ষোভের স্থান হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করে। পরে আন্দোলনের ব্যাপ্তি বাড়লে বিক্ষোভের একটি বড় অংশ রামলীলা ময়দানে স্থানান্তরিত হয়।

তবে এই স্থান নিয়ে আইনি টানাপোড়েন নতুন নয়। ২০১৭ সালে ভারতের জাতীয় পরিবেশ আদালত (এনজিটি) শব্দদূষণ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অসুবিধার দোহাই দিয়ে সেখানে বিক্ষোভ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেই নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে জানিয়েছিল যে, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার ও স্থানীয়দের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।

ভারতীয় সংবিধানে শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার থাকলেও, কোনো স্থানকে কেন্দ্র করে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার প্রশ্নটি এখনো প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে জননিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যবস্থার অজুহাতে প্রতিবাদস্থলকে শহরের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেওয়ার ফলে গণতান্ত্রিক পরিসর কতটুকু সংকুচিত হবে, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

শেয়ার করুন