১৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দক্ষ মানবসম্পদই হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী চালিকাশক্তি

প্রকাশ:

একটি দেশের অর্থনীতির দৃশ্যমান শক্তি হলো সড়ক, সেতু, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পাঞ্চল। তবে উন্নত অর্থনীতির পথে এগিয়ে যাওয়ার আসল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে মানুষের মেধা, দক্ষতা, প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা এবং উদ্ভাবনী শক্তির মধ্যে। বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে সস্তা ও প্রচুর শ্রমশক্তির পুরোনো মডেল থেকে বেরিয়ে এসে উৎপাদনশীল ও জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর মনে করেন, বিনিয়োগকে উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এখন সময়ের দাবি। তার মতে, উৎপাদন ও বিনিয়োগকে অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। তিনি বলেন, ঋণনির্ভর ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতির ধারা থেকে বেরিয়ে এসে উৎপাদনমুখী, বিনিয়োগ-বান্ধব ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার বদ্ধপরিকর। পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্বিন্যাস করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। অর্থাৎ বিনিয়োগ যেন শুধু সম্পদ তৈরি না করে, উৎপাদন বাড়ায়; উৎপাদন যেন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং সেই কর্মসংস্থান যেন আয় ও রাজস্ব বাড়িয়ে অর্থনীতিকে আরও বিস্তৃত করে। তার বক্তব্যে শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা নয়, কর্মসংস্থানের মান এবং শ্রমিকের দক্ষতাকেও অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন দক্ষ শ্রমশক্তি, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়েছেন। তার মতে, শ্রমজীবী মানুষই জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আধুনিক বিশ্বে প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হয়ে উঠেছে মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবন। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ টেনে বলেন, বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন কেবল কতজনকে শিক্ষিত করা হলো তা নয়, বরং তারা কতটা দক্ষ হয়ে উঠল এবং অর্থনীতিতে তাদের সেই দক্ষতা কীভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর যুগে এই পরিবর্তনের গতি আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চের (সিএসইআর) চেয়ারম্যান ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাকিফ শামীম উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতিতে উত্তরণের ইতিহাস পর্যালোচনা করেছেন। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কোনো দেশ কেবল অবকাঠামো কিংবা সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে উন্নত হতে পারে না। এলডিসি উত্তরণের পরবর্তী পর্যায়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতা মাথায় রেখে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার ভিত্তি প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার পরিবর্তে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার দিকে নিয়ে যেতে হবে। এর অর্থ হলো, একই সংখ্যক কর্মীকে দিয়ে আরও বেশি মূল্য সংযোজন করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের এপ্রিলের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট অনুযায়ী, বর্তমান অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নানা চাপের মুখে রয়েছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, যারা ১৯৫০-এর দশকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে কয়েক দশকের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোরিয়ার প্রকৃত জিডিপি গড়ে বার্ষিক ৫.৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাদের মাথাপিছু আয় ১৯৫০-এর দশকের প্রায় ৬৭ ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৩৬,৬২৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জগুলোও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় অর্ধেকই বর্তমানে কম বেতনের কাজে নিয়োজিত, যা দেশে দক্ষতার অসামঞ্জস্যের একটি পরিষ্কার ইঙ্গিত। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করা তরুণদের তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার ছিল কম, যা একটি অশনি সংকেত। এছাড়া, অনেক নতুন কর্মসংস্থান অধিক উৎপাদনশীল খাতের পরিবর্তে কম উৎপাদনশীল খাতে তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায়ে জ্ঞান ও দক্ষতানির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা এখন সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী বের হলেও শিল্প ও ব্যবসা খাতের চাহিদার সঙ্গে তাদের দক্ষতার সমন্বয় সবসময় বজায় থাকে না। তাইওয়ানের মতো দেশগুলো কৃষি ও শ্রমনির্ভর উৎপাদন থেকে সরে এসে শিক্ষা, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গবেষণায় বিনিয়োগের মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিকসের মতো শিল্পে বৈশ্বিক নেতৃত্ব নিয়েছে। বাংলাদেশেও এখন এমন একটি শিক্ষা ও উদ্ভাবন ব্যবস্থা প্রয়োজন যা উদ্যোক্তা, গবেষক, প্রযুক্তিবিদ এবং দক্ষ কর্মী তৈরি করতে সক্ষম হবে। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যেও বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এজন্য শিল্পায়ন ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সেই দক্ষ শ্রমশক্তিই পরে গাড়ি, ইলেকট্রনিকস, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প গড়ে তোলে। অথচ শিল্প ও ব্যবসা খাতে নির্দিষ্ট দক্ষতার কর্মীর ঘাটতির কথা শোনা যায়।

শেয়ার করুন