রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকায় বাস রুট র্যাশনালাইজেশন বা ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক পরিবহন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বর্তমানে চলমান অগোছালো বাস সার্ভিসগুলোকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা। অবশ্য দেড় দশক ধরে বিভিন্ন সরকার ও দুই সিটি করপোরেশনের মেয়ররা একই ধরনের পরিকল্পনা করেছেন। এ লক্ষ্যে সরকার, ব্যাংক ও পরিবহনমালিকদের মধ্যে অনেক সভা হয়েছে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ঢাকার পরিবহন খাতের বর্তমান সংকট ও উত্তরণের পথ নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রাথমিকভাবে দুটি রুট নির্বাচন করে কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে চালু থাকা ৯৮টি বাস রুটকে পুনর্বিন্যাস করে ৩২টিতে নামিয়ে আনা হবে। প্রতিটি নির্দিষ্ট রুটে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে বাস চলাচল করবে। এই ব্যবস্থায় প্রতিটি রুটের জন্য নির্ধারিত স্টপেজ থাকবে, কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে হবে এবং ই-টিকেটিং ও জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি বাসের অবস্থান ও গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে। সংস্থাটির অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মো. মশিউর রহমান জানান, ৩২টি রুটের মধ্যে প্রথম ধাপে আগামী ছয় মাসের মধ্যে পাঁচটি রুট চালু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যমান বাসমালিকদের সমন্বয়ে পাঁচটি আলাদা কোম্পানি গঠন করা হবে এবং নিশ্চিত করা হবে যে, প্রতিটি রুটে কেবল নির্দিষ্ট রঙের বাসই চলবে। তবে নতুন নাকি পুরোনো বাসে এই পরিষেবা চলবে, তা পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই ও ফিটনেস পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য হলো পরিবহন ব্যবসার বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা কমিয়ে আনা। বর্তমানে বিভিন্ন কোম্পানির বাস যাত্রী পাওয়ার আশায় রাস্তায় অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, যা প্রায়ই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নতুন পদ্ধতিতে বিনিয়োগের অনুপাতে মালিকেরা মুনাফা পাবেন এবং চালক ও শ্রমিকেরা দৈনিক চুক্তির পরিবর্তে কোম্পানির নিয়মিত মাসিক বেতনভুক্ত কর্মী হিসেবে কাজ করবেন। এতে নির্ধারিত সময়ে বাস ছাড়ার নিশ্চয়তা বাড়বে এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামানো বন্ধ হবে। যাত্রী পেতে বাসগুলোর মধ্যে চলে প্রতিযোগিতা। যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী ওঠানো, অন্য বাসকে পেছনে ফেলার চেষ্টা এবং সড়কে বিশৃঙ্খলা নিত্যদিনের ঘটনা।
২০১৫ সালের দিকে প্রথম বড় ধরনের পরিকল্পনায় পুরোনো বাস সরিয়ে কয়েক হাজার নতুন বাস নামানোর কথা বলা হয়েছিল। এছাড়া ২০২১ সালে ২৪৬টি কোম্পানিকে একীভূত করে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই সময় ঘাটারচর থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ২৬ নম্বর রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ চালু করা হলেও তা টেকসই হয়নি। মূলত রাজনৈতিক প্রভাব, পরিবহন মালিকদের অনাগ্রহ ও সমন্বয়ের অভাবে আগের সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। সমাধান হিসেবে ২০০৪ সালে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (এসটিপি) বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকার চার হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে মাত্র ২৮০ কিলোমিটার রাস্তা বাস চলাচলের উপযোগী। তেজগাঁওয়ে ডিটিসিএ কার্যালয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ড্রোনের সহায়তায় প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের প্রকৌশলগত নকশা তৈরি করা হয়েছে। ৫২টি পয়েন্টে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন পর্যবেক্ষণ করে এই সমীক্ষা চালানো হয়, যেখানে ৩৫ হাজার যাত্রীর যাতায়াত প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর ওঠানামা এবং ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রীর যাত্রার শুরু ও গন্তব্যও দেখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ৩২টি রুটের মধ্যে পাঁচটি রুটে ১২ মিটার দীর্ঘ ৫২ আসনের আধুনিক বাস চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া যানজট নিরসনে ২৫টি চক্রাকার বাস রুট চালুর চিন্তাও করা হচ্ছে, যা মেট্রোরেল স্টেশনগুলোর সঙ্গে যাত্রীদের সংযোগ স্থাপন করবে। এর মাধ্যমে মূল সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচলও কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে, তবে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চালকদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম জানিয়েছেন, তারা সরকারকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে তিনি মনে করেন, কেবল সরকারি নির্দেশনায় এটি সফল হবে না। সরকারকে নীতিসহায়তা প্রদান এবং ব্যাংকঋণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, অতীতে বিআরটিসিকে দিয়ে এ ধরনের উদ্যোগ সফল হয়নি, তাই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
বুয়েট অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান মনে করেন, শুধু রুট কমিয়ে ৩২টি করাই যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, বাসের সংখ্যা ও মান নিয়ন্ত্রণ, কঠোর সময়সূচি পালন, আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরিবহন খাতে রাজনৈতিক প্রভাব দূর করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বাসমালিকদের নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে না পারলে এই উদ্যোগও আগের মতোই ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার গণপরিবহন খাতের উন্নয়নে একাধিক বৈঠক করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার এই পুরোনো চ্যালেঞ্জিং প্রকল্পটিকে নতুন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এবার পুরোনো বাস রং করে উদ্যোগটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।





