২৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চলনবিলে অবাধে শামুক-ঝিনুক নিধন, ঝুঁকিতে জলজ জীববৈচিত্র্য

প্রকাশ:

চলনবিলে পানি নামতে শুরু করায় এখন বিলজুড়ে চলছে নির্বিচারে শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহের মহোৎসব। প্রতি বছর জুলাই থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত চলে এই কর্মযজ্ঞ। তবে এবার বর্ষার পানি দেরিতে নামার কারণে এই প্রক্রিয়া আরও এক মাস দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ শামুক ও ঝিনুকের এই ব্যাপক নিধনের ফলে হুমকির মুখে পড়ছে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য।

উপজেলার হামকুড়িয়া, ঘরগ্রাম, কুন্দইল, কামাড়শোন, মাকড়শোন, নাদোসৈয়দপুর ও মাগুড়া বিনোদসহ ২০-২৫টি এলাকায় বর্তমানে ৪ থেকে ৫শটি নৌকায় করে স্থানীয়রা প্রতিদিন শামুক সংগ্রহ করছেন। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, প্রতিদিন এখান থেকে প্রায় দুই থেকে তিন টন শামুক ও ঝিনুক তোলা হচ্ছে। স্থানীয় দরিদ্র কৃষক ও মৎস্যজীবীদের ছোট ডিঙি নৌকা দিয়ে সহায়তা করছে একটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ী চক্র। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একজন সংগ্রহকারী তিন থেকে চার বস্তা পর্যন্ত শামুক সংগ্রহ করতে সক্ষম হচ্ছেন। প্রতি বস্তা শামুক ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এবং এ থেকে একজন সংগ্রহকারী প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন বিলাঞ্চল থেকে ব্যাপকহারে শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়। উপজেলার হামকুড়িয়া, ঘরগ্রাম, কুন্দইল, কামাড়শোন, মাকড়শোন, নাদোসৈয়দপুর ও মাগুড়া বিনোদসহ ২০-২৫টি এলাকায় প্রায় ৪-৫ শত নৌকাযোগে স্থানীয় লোকজন প্রতিদিন শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহ করছেন। শামুক সংগ্রহকারী মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘বর্ষার সময়ে আমাদের কাজ থাকে না।

সংগ্রহকারীরা বলছেন, বর্ষাকালে কৃষি কাজ বন্ধ থাকায় পেটের দায়েই তারা এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল মমিনের মতে, চলনবিলে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন ব্যবসায়ী রয়েছেন। তারা সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে শামুক কিনে দেশের কুষ্টিয়া, নোয়াখালী, বরিশাল, বাগেরহাট ও যশোরসহ বিভিন্ন জেলার মাছের খামারে খাদ্য হিসেবে বিক্রি করেন। ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, চলনবিলে প্রতি বছর প্রায় কোটি টাকার শামুক বেচাকেনা হয়।

তাড়াশ ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিদ্যুৎ কুমার জানান, ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে শামুককে জলজ প্রাণী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। উন্মুক্ত জলাশয়, খাল-বিল ও হাওর-বাঁওড়ে শামুক ও ঝিনুক বংশবিস্তার করে এবং নোংরা পোকামাকড় খেয়ে পানি বিশুদ্ধকরণে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি মিঠাপানির মাছের প্রধান খাদ্য হিসেবেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আইন থাকা সত্ত্বেও এর প্রয়োগ না থাকায় শামুক নিধন বন্ধ করা যাচ্ছে না। জলাশয়ের নোংরা পানির পোকামাকড় আহারের মাধ্যমে এগুলো পানি বিশুদ্ধকরণেও ভূমিকা রাখে।

মৎস্য সংরক্ষণ আইনে শামুক নিধন সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট বিধিনিষেধ না থাকায় মৎস্য অধিদপ্তরও এক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, চলনবিলে শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহের বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজনে অসাধু সংগ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শেয়ার করুন