১৯ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্রমেই বড় বস্তিতে পরিণত হচ্ছে রাজধানী ঢাকা

প্রকাশ:

বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর ঢাকা বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থানের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উন্নত সেবা ও কাজের সন্ধানে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অগণিত মানুষ রাজধানীমুখী হচ্ছে। এই স্রোতের একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য থেকে যায়, যার ফলে নগরীর জনসংখ্যা ও অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ছে লাগামহীনভাবে। ক্রমাগত নতুন ভবন ও প্রতিষ্ঠানের চাপে সবুজায়ন ও উন্মুক্ত জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। নাগরিক সেবার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে ব্যর্থ হচ্ছে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মতো মৌলিক চাহিদাগুলো ঠিকমতো সরবরাহ করতে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের অবস্থাও নাজুক এবং এসব সেবার একটি বড় অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই নাগরিক প্রয়োজনে মানুষ ছোটে রাজধানীর দিকে। রাজধানীতে আসা এই মানুষদের একটা অংশ আর ফিরে যায় না। এই রিকশা নিয়ন্ত্রণে কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না। নগরের পরিধি বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ আর তদারকি ছাড়াই। এতে রাজধানী ক্রমে পরিণত হচ্ছে বড় এক বস্তিতে।

সিটি করপোরেশনগুলো প্রতি বছর শত কোটি টাকা খরচ করে ফুটপাথ সংস্কার করলেও সাধারণ মানুষ তা ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে না। প্রভাবশালী চাঁদাবাজদের দখলে থাকা ফুটপাথ এবং সড়কের বিশৃঙ্খলা ঢাকার নিত্যদিনের বাস্তবতা। পুরনো প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরেনি, বরং নতুন উপদ্রব হিসেবে যুক্ত হয়েছে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও তদারকির অভাবে শহরটি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে; যেকোনো সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের মতো বিপর্যয় মোকাবিলা করা দুরূহ হয়ে পড়বে। বিভিন্ন সরকারের আমলে বাস্তবায়িত একের পর এক মেগা প্রকল্প যেমন যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার বা ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প যানজট কমানোর বদলে নতুন ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে। সমন্বয়ের অভাব ও ভুল পরিকল্পনা শহরকে আরও জটিল সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু সেই ফুটপাথে নাগরিকরা হাঁটতে পারেন না। উল্টো দিনে দিনে নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় যাচ্ছে পরিস্থিতি।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সরকারের ভুল পরিকল্পনাকেই গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী মনে করেন। তিনি বলেন, ২০০৫ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় সহজ ও সাশ্রয়ী অনেক উদ্যোগের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাম্মী আক্তার সেতু জানান, আবাসন, চাকরি ও উন্নত চিকিৎসার সব সুযোগ ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হওয়ায় মানুষের ভিড় কমছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি উত্তরণে কেন্দ্রীয় সেবার সমন্বয় প্রয়োজন। একইসঙ্গে নাগরিক সেবাগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ এবং সারা দেশে সুষম কর্মসংস্থান তৈরি করা জরুরি। স্বাস্থ্যসেবার চাপ কমাতে জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, হাসপাতাল ও আধুনিক ডায়াগনস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করা ছাড়া ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য রাখা অসম্ভব। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া এই জঞ্জাল দূর করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা। ভাঙাচুরা গণপরিবহন আর বিশৃঙ্খল যাতায়াতের কারণে মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই।

শেয়ার করুন