আগামী বছরের শুরুতে অনুষ্ঠেয় উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে ক্ষমতাসীন বিজেপির উদ্বেগ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দলীয় অন্দরের কলহ মেটাতে ও শরিকি অসন্তোষ নিরসনে বিশেষ তৎপরতা শুরু করেছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। লক্ষ্ণৌ সফরে গিয়ে শুক্রবার তিনি রাজ্যের সব জেলার আড়াই হাজার দলীয় নেতা-কর্মীর এক সম্মেলনে অংশ নেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন যে, দলের স্বার্থে নেতা-কর্মীদের সমস্ত ব্যক্তিগত ক্ষোভ, মান-অভিমান এবং অপ্রাপ্তির বেদনা গোমতী নদীর জলে বিসর্জন দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কিন্তু দলের স্বার্থে এখান থেকে বেরোনোর পর তা গোমতীর জলে বিসর্জন দিন। এ অবস্থায় দলীয় অসন্তোষ দূর করতেই অমিত শাহকে তৎপর হতে হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও রাজস্থানে তা চালুর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। অথচ ২০১৭ সালে ক্ষমতাসীন হয়েও উত্তর প্রদেশে বিজেপি ওই রাস্তায় হাঁটেনি। অর্থাৎ ভোটের আগে রাজ্যের রাজনৈতিক মেরুকরণে বদল ঘটতে পারে। এই দলের প্রভাব প্রধানত পশ্চিম উত্তর প্রদেশের জাটদের মধ্যে।
শাহ বলেন, কোনো একক নেতার পক্ষে সবাইকে নির্বাচনে জেতানো সম্ভব নয়। বরং মাঠপর্যায়ের কর্মীরাই জয়ের মূল ভিত্তি। সম্প্রতি বিধান পরিষদের নির্বাচনে বিজেপির ফল আশানুরূপ হয়নি। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী এলাকা বারানসির দুটি আসনেই বিজেপি প্রার্থীরা সমাজবাদী পার্টির (এসপি) কাছে পরাজিত হয়েছেন। এছাড়া এলাহাবাদ, লক্ষ্ণৌ ও আগ্রার আসনেও সমাজবাদী পার্টির জয় বিজেপির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। এই ফলাফলের তাৎপর্য হলো, শিক্ষক ও স্নাতকদের মতো শিক্ষিত ভোটারদের বড় একটি অংশ বিজেপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। শাহ বলেন, কোনো নেতাই একা সবাইকে জেতাতে পারেন না। সেই আসনগুলোর প্রত্যেকটিতেই বিজেপি পুরোনোদের বাতিল করে নতুন প্রার্থী দেয়।
শিক্ষিত যুব সমাজের এই অনীহা বিজেপির জন্য উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যখন দেশজুড়ে ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিধানসভার ভোটের আগে এসপির এই ৫ আসনে জয় বিজেপির দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে এই জন্য যে এবারের ভোটাররা ছিলেন শুধু শিক্ষক ও স্নাতকেরা। কেননা, ‘ভোটচুরি’র বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তার পুরোভাগে রয়েছে শিক্ষিত যুব সমাজ।
দলের অন্দরেও অসন্তোষ স্পষ্ট।
রাজ্যসভার ১১টি আসনের নির্বাচনে পুরনো নেতাদের বাদ দিয়ে নতুনদের মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত দলীয় কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে মনে ক্ষোভ বা হতাশা জন্মাতেই পারে।
এদিকে, হিন্দুত্ববাদী আবেগকে কাজে লাগাতে অমিত শাহ রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) চালুর নতুন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি জানান, ক্ষমতায় টিকে থাকলে এনডিএ শাসিত ২১টি রাজ্যে ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের আগেই ইউসিসি বাস্তবায়ন করা হবে। ওই বৈঠকে তিনি বলেন, এবার ক্ষমতায় এসে তাঁরা রাজ্যে ইউসিসি চালু করবেন। দেশের মধ্যে প্রথম ইউসিসি চালু হয় বিজেপিশাসিত উত্তরাখন্ডে। তারপর একে একে গুজরাট, আসাম ও মধ্য প্রদেশ বিধানসভায় অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল পাস করা হয়েছে। জনগণ আপনাদের তৃতীয় প্রজন্মদেরও ক্ষমা করবে না।
অমিত শাহ সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবকে আক্রমণ করে বলেন, আগামী ৩০ বছরেও অখিলেশের দল উত্তর প্রদেশে ক্ষমতায় ফিরতে পারবে না। এর জবাবে অখিলেশ যাদব পাল্টা কটাক্ষ করে বলেন, বিজেপির শাসনামলে ১০ বছর পার হলেও ইউসিসি বাস্তবায়িত হয়নি, তাই স্রেফ বক্তৃতার মাধ্যমে নির্বাচন জেতা সম্ভব নয়। ১০ বছর ক্ষমতায় থেকেও বিজেপি কেন রাজ্যে ইউসিসি চালু করতে পারেনি সেই প্রশ্ন তুলে অখিলেশ বলেন, ‘আপনারা অনেক দেরি করে ফেলেছেন স্যার। স্রেফ বক্তৃতা করে ভোটে জেতা যায় না। অখিলেশের প্রতি দলের অনেকেই ঝুঁকতে চাইছেন।
বিজেপির শরিকি দলগুলোর মধ্যে নিষাদ পার্টি এবং সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টির অসন্তোষ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। নিষাদ পার্টির নেতা সঞ্জয় নিষাদ স্পষ্ট জানিয়েছেন, পরিস্থিতি না পাল্টালে তারা বিকল্প পথ বেছে নেবেন। অন্যদিকে, ওমপ্রকাশ রাজভরের দলের ভেতরেও বিদ্রোহ ও দলত্যাগের ঘটনা ঘটছে। রাষ্ট্রীয় লোকদল, যারা বর্তমানে এনডিএর শরিক, তাদের প্রধান জয়ন্ত চৌধুরীর অবস্থান এখনো ধোঁয়াশায় ঢাকা। মূলত বিধান পরিষদের নির্বাচনে ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান এবং দলের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এখন অমিত শাহের এই সফরের মূল লক্ষ্য। পাশাপাশি উত্তর প্রদেশে এনডিএর শরিকদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নিষাদ পার্টি জেতে ১১ আসনে, সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টি পেয়েছিল ৬টি আসন। জয়ন্ত চৌধুরীর রাষ্ট্রীয় লোকদল ২০২২ সালের ভোটে অখিলেশের সঙ্গে জোট বেঁধে ৮টি আসন জিতেছিল। পরে জোটত্যাগ করে আরএলডি এনডিএর শরিক হয়।





