৩০ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আফগানিস্তানে চরম দারিদ্র্যে শিশুবিয়ের হার বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে

প্রকাশ:

আফগানিস্তানের বাদঘিস প্রদেশে তীব্র খরা ও ফসলহানি জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দীর্ঘস্থায়ী এই দুর্যোগে সেখানকার ৯৫ শতাংশ মানুষ, যারা কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল, তাদের আয়ের উৎস হারিয়েছেন। চরম অভাব ও ঋণ পরিশোধের তাগিদে অনেক পরিবার এখন তাদের শিশুসন্তানদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ১৫ বছর বয়সী দারেল্লা, যে এখন ৩০ বছর বয়সী স্বামীর ঘরে অন্তসত্ত্বা, নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলে, ‘আমি এখনো শিশু, এই বয়সে বিয়ে কোনো ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে না।’ খরায় বাস্তুচ্যুত এই কিশোরী এখন ৩০ বছর বয়সী স্বামীর সংসারে। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাবার বাড়িতে এসে নিজের বিয়ের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে এমনটি বলেছে সে। আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বাদঘিস প্রদেশে খরা ও ফসলহানির কারণে ঋণ শোধ, খাবার কেনা কিংবা চিকিৎসার খরচ জোগাতে মেয়েশিশুদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন বহু পরিবার। মেয়েটি বিয়ের পর ১৫ ঘণ্টার দূরত্বে চলে গেলে তাকে আর দেখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তার মা।

পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচাতে শিশুদের ওপর এই নির্মম দায় চাপানো হচ্ছে। ১১ বছরের খাতিরাকে ২০ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। তার মা নূর বিবি জানান, বাগদানের পর থেকেই খাতিরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে; সারাক্ষণ কান্নাকাটি ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটায় সে, এমনকি হবু স্বামী বাড়িতে এলে সে পালিয়ে যায়। নাজিলার মতো মাত্র পাঁচ বছর বয়সী শিশুর ভাগ্যেও জুটেছে ১৫ বছর বয়সী হবু স্বামী। আবার দুই বছরের ফাতেমাহকে বিয়ের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হয়েছে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত আট বছরের ভাইয়ের চিকিৎসার খরচ জোগানোর জন্য।

বংশপরম্পরায় এই করুণ পরিণতি চলছে। খোশকিয়ান গ্রামের আবদুল আজিজ আট বছরে সাতবার ফসল হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। পরিস্থিতির শিকার হয়ে তিনি পাঁচ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তার মেয়ে মাজরি ১২-১৩ বছর বয়সে স্বামীর ঘর করার পর এখন ১৬-১৭ বছর বয়সে দুই সন্তানের জননী। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে অনেক পরিবার আরও ভয়াবহ পথ বেছে নিয়েছে; খাবারের জন্য এক বাবা নিজের ১০ বছর বয়সী ছেলের কিডনি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন। ১২ বছর বয়সী আয়েশাকেও ২০ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার বাবা। কিন্তু বিয়ের অর্থ পাওয়ার পরও তাদের দারিদ্র্য কাটেনি, উল্টো এখন বাড়িভাড়া দিতে না পারায় উচ্ছেদের হুমকিতে আছে পরিবারটি। জীবিকা হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে আশ্রয় নিচ্ছেন।

আয়েশার মা সারা তাকে পড়াশোনা করতে উৎসাহ দিচ্ছেন, অন্তত শৈশবটুকু বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টায়। ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনালের আফগানিস্তানবিষয়ক কর্মকর্তা মার্ক ক্যালডার জানান, এই অল্প বয়সের বিয়ে মেয়েদের জন্য প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। অথচ দেশটিতে সাহায্য সংস্থাগুলোর কার্যক্রম কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও ক্লিনিকগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের বিয়ের অর্থ সাধারণত কিস্তিতে পরিশোধ করা হয় এবং পুরো টাকা পাওয়ার পর পাত্রপক্ষ তাদের নিয়ে যায়। বয়ঃসন্ধি পার হওয়ার আগেই এসব শিশুকন্যাকে সংসার ও মাতৃত্বের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কাজ না পেয়ে অনেকেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পরই তাদের সংসার ও মাতৃত্বের দায়িত্ব নিতে হয়। সারা মেয়ের সামনে বিয়ের কথা বলতে পারেন না।

শেয়ার করুন