১৬ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অভাবী মেধাবীদের স্বপ্ন পূরণে অদ্বিতীয়া বৃত্তির অনুপ্রেরণা

প্রকাশ:

দরিদ্র পরিবারের অদম্য মেধাবী নারী, যাঁরা সব বাধা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁদের স্বপ্ন পূরণে পাশে দাঁড়িয়েছে আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসি ও ট্রাস্ট। তাঁদের অনেকেই দেশে-বিদেশে ভালো অবস্থানে আছেন। তাঁর এই কষ্ট, তাঁর স্বপ্ন ছোটবেলা থেকে আমাকেও প্রভাবিত করেছে।

এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) ছাত্রীদের পড়াশোনার খরচ ও আবাসন সুবিধা নিশ্চিতে চালু হয়েছে ‘অদ্বিতীয়া’ বৃত্তি। আবাসন, টিউশন ফি মওকুফসহ নানা সুবিধা দেয় এই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

২০১২ সাল থেকে ট্রান্সকম গ্রুপের সহযোগিতায় ৪২ জন এবং ২০১৭ সাল থেকে আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসির সহায়তায় ১০১ জন—সর্বমোট ১৪৩ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তির মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। এর মধ্যে ৮৬ জন স্নাতক সম্পন্ন করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন। চলতি বছর নতুন করে আরও ১৫ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তি লাভ করেছেন। তাঁদের মধ্য থেকে পাঁচজনের সংগ্রামী জীবনের গল্প তুলে ধরা হলো। ৮৬ জনের এরই মধ্যে স্নাতক শেষ হয়েছে।

শ্রীমঙ্গলের কালীঘাট চা-বাগানের চা-শ্রমিকের সন্তান আমি। বাবার প্রতিদিনের মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা। তীব্র অভাব সত্ত্বেও বাবার স্বপ্ন ছিল আমি যেন শিক্ষিত হয়ে বড় হই। আমি কখনো গাইড বই কেনার সামর্থ্য রাখিনি, বন্ধুদের কাছ থেকে বই ধার করে পড়েছি। স্মার্টফোন না থাকায় পিসতুতো ভাইয়ের ফোনে ইউটিউব দেখে ক্লাস করতাম। এভাবেই ২০২২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২৪ সালে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ অর্জন করি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত ও পড়াশোনার খরচ জোগাতে পরিবারের হিমশিম অবস্থা। অদ্বিতীয়া বৃত্তি আমার পড়াশোনার পথে সাহস জোগাবে। একাদশ শ্রেণিতে ওঠার পর কোচিং করার সামর্থ্য ছিল না। রেজাল্ট হয়তো খুব ভালো না; কিন্তু এর পেছনে যে কী সংগ্রাম ছিল, সেটা শুধু আমি আর আমার পরিবারই জানি।

অন্য এক শিক্ষার্থীর ভাষ্যমতে, ২০২৩ ও ২০২৫ সালে তিনি যথাক্রমে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছেন। অভাবের কারণে পড়াশোনা করতে যে সংগ্রাম তাঁকে করতে হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাতজন। বাবার কৃষি কাজ আর মায়ের চা-বাগানের সামান্য আয়ে সংসার চালানো কঠিন। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, ছোট দুই বোনও শিক্ষার্থী। বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য প্রতি মাসে বাড়ি থেকে টাকা পাঠাতে হয়, যা মা-বাবার জন্য বাড়তি বোঝা। এই বৃত্তি তাঁদের আর্থিক কষ্ট লাঘব করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সব সময় ভেবেছি, একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়ে বাবার কষ্ট দূর করব। ছোট দুই বোনের একজন অষ্টম শ্রেণিতে, অন্যজন প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।

পরিবারের শিক্ষার সুযোগ কম থাকলেও মা-বাবার স্বপ্ন ছিল সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করা। ছোট এক মাচাং ঘরে জন্ম নেওয়া এই শিক্ষার্থী জানান, তাঁদের পরিবার জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। অনেক দিন না খেয়েও কাটাতে হয়েছে, স্কুলের পোশাক কেনার টাকা না থাকায় অন্যের জুমে কাজ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে ঢাকায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে এক সিনিয়র শিক্ষার্থীর মাধ্যমে এই বৃত্তির খবর পান। বর্তমানে তিনি প্রি-আন্ডারগ্র্যাড পাথওয়ে কোর্সে পড়াশোনা করছেন। তার ছোট বোন নার্সিংয়ে পড়ার খরচও মা-বাবার জন্য চ্যালেঞ্জিং।

বাবা কিডনি রোগে মারা যাওয়ার পর পরিবারের দায়িত্ব এখন গৃহিণী মায়ের কাঁধে। ভাইয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের খরচ চালানো ছিল অসম্ভব কষ্টকর। কোনো নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস না থাকায় নিজের পড়াশোনার ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছিল। এখন অদ্বিতীয়া বৃত্তি পাওয়ায় হাতখরচের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমেছে। তিনি পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন।

মা-বাবার বিচ্ছেদের পর তিন ভাই-বোনকে নিয়ে মায়ের সংগ্রাম ছিল অতুলনীয়। নিজেদের বাড়ি না থাকায় মামার বাড়িতে বড় হওয়া এই শিক্ষার্থী জানান, মা মানুষের বাড়িতে কাজ করে তাঁদের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। মেজ ভাই পড়াশোনা ছেড়ে কাজ করে পরিবারকে সহায়তা করেছেন। ২০২৪ সালে এইচএসসি পাসের পর দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বৃত্তিসহ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান তিনি। তাঁর লক্ষ্য হলো, নিজের মতো আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে সহায়তা করা।

শেয়ার করুন