শান্তির জন্য যুদ্ধ কি সত্যিই কার্যকর? এক গভীর বিশ্লেষণ

প্রকাশ:

শান্তির জন্য যুদ্ধ একটি বড় প্যারাডক্স বা স্ববিরোধিতা। অধিকাংশ কূটনৈতিক চুক্তি বড় দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে তৈরি হয়। অনেক সময় মানবিক কারণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দেশগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে অবিশ্বাসের জন্ম দেয় এবং চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে অর্জিত শান্তি প্রায়শই দীর্ঘস্থায়ী হয় না, যার পেছনে আদর্শিক ভিত্তির অভাব, রাজনৈতিক ও জাতীয় স্বার্থের প্রাধান্য এবং মূল সঙ্কটের সমাধান না হওয়ার মতো গভীর কারণ রয়েছে।

শান্তির জন্য যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে অনেক সময় পরবর্তী কৌশল বা পুনর্গঠন পরিকল্পনার অভাব দেখা যায়। যেমন— লিবিয়ার উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, যথাযথ পরিকল্পনার অভাবে শান্তি রক্ষার উদ্যোগ দেশটিকে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এছাড়া, যে চুক্তিতে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, মানবাধিকার এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত হয় না, তা প্রকৃত শান্তি আনতে পারে না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বড় দেশগুলোর আধিপত্য এবং ভেটো ক্ষমতার মতো বিষয়গুলো শান্তিপ্রক্রিয়াকে পক্ষপাতদুষ্ট করে তোলে।

বিশ্বসাহিত্যের কালজয়ী উপন্যাসগুলো যুদ্ধের অসারতাকে বারবার ফুটিয়ে তুলেছে। লিও তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ উপন্যাসে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং সাধারণ মানুষের ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণের বিষয়টি উঠে এসেছে। তলস্তয় বিশ্বাস করতেন যে, নেপোলিয়নের মতো শাসকরা নয়, বরং মানুষের ছোট ছোট সম্মিলিত কর্মকাণ্ডই ইতিহাস গড়ে। এছাড়া এরিখ মারিয়া রেমার্কের ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ এবং আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’-এর মতো অমর গ্রন্থগুলো যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা ও মানসিক ধ্বংসলীলার চিত্র তুলে ধরেছে, যা শান্তির জন্য যুদ্ধের অনুমোদন দেয় না।

শান্তির জন্য যুদ্ধের যৌক্তিকতা প্রায়ই একটি দেশের সার্বভৌমত্বের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। সামরিক হস্তক্ষেপ মানবিক উদ্দেশ্যে হলেও অনেক সময় তা অন্য স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে কৌশলগত গুরুত্বহীন দেশগুলোর তুলনায় খনিজসম্পদ সমৃদ্ধ দেশগুলোতে দ্রুত সামরিক হস্তক্ষেপের প্রবণতা এ ধরনের যুদ্ধের নৈতিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকেও কেবল কূটনৈতিক চুক্তি বা সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে প্রকৃত শান্তি বলা যায় না। ন্যায়বিচার, সুষম বণ্টন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া অর্জিত শান্তিকে আদর্শিক পরাজয় হিসেবেই গণ্য করা হয়। প্রকৃত শান্তি মানুষের হৃদয়ে গ্রোথিত হতে হয়, যা কেবল কাগজের চুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকলে দীর্ঘস্থায়ী হওয়া সম্ভব নয়।

শেয়ার করুন