বাংলাদেশের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার সম্পর্ক নতুন করে শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এই প্রস্তাবে বাংলাদেশ সরকার ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যদি প্রস্তাবিত চুক্তিটি বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে তা এগিয়ে নিতে সরকারের কোনো আপত্তি নেই।
সম্প্রতি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল বিশেষ দূত সার্জিও গরের তিনদিনের ঢাকা সফরকালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি আলোচনায় আসে। সফরকালে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাত করেন। এই সফরে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার লক্ষ্যে নতুন একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
ওয়াশিংটনের এই প্রস্তাব সম্পর্কে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, সরকারের অবস্থান ইতিবাচক। তিনি স্পষ্ট করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি যদি দেশের মানুষের স্বার্থে হয়, তবে সরকার অবশ্যই তাতে এগিয়ে যাবে। তবে চুক্তির শর্ত যদি জনগণের স্বার্থের পরিপন্থি হয়, তাহলে সেটি পুনর্বিবেচনা করা হবে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো উদ্যোগ নয়। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮১ সালে প্রথম বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, যা ১৯৯১ সালে নবায়ন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় চুক্তিটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। বর্তমান প্রস্তাবের মাধ্যমে সেই পুরোনো সহযোগিতা কাঠামোকে নতুন আইনি ভিত্তির আওতায় পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
যদিও প্রস্তাবিত এমওইউ’র খসড়া বা বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এর মাধ্যমে বেসামরিক পারমাণবিক খাতে দুই দেশের সহযোগিতার আইনি ভিত্তি তৈরি হবে। এই সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত হলেও তা কেবল শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ‘১২৩ অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে পরিচিত এই চুক্তিগুলো শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, গবেষণা ও উপকরণ বিনিময়ের সুযোগ দেয়, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তাররোধ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিবিধান মেনে পরিচালিত হয়। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের ১১ই জুলাই পর্যন্ত ৫০টি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ২৬টি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি কার্যকর রয়েছে।
সার্জিও গরের সফরে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্য সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) বাস্তবায়নের পথে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরেছে। বিশেষ করে, বি-১ ও বি-২ ভিসা আবেদনকারীদের জন্য ২০ হাজার ডলারের ভিসা বন্ডের শর্ত নিয়ে ঢাকা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ মনে করে, এটি একটি অশুল্ক বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা, যা বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের যুক্তরাষ্ট্র সফর নিরুৎসাহিত করতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, সার্জিও গরের এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতাকে এগিয়ে নেওয়া, আর বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার প্রস্তাবটিকে সেই বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।





