সৌদি আরব বর্তমানে এক কঠিন উভয় সংকটে নিপতিত হয়েছে। ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রিয়াদ যতটা সম্ভব সংঘাতের বাইরে থাকার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। কিন্তু তিন দিক থেকে হামলার শিকার হওয়ার পর পরিস্থিতি এখন ভিন্ন মোড় নিয়েছে। চলতি সপ্তাহে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরান-সমর্থিত ইরাকি প্রক্সি মিলিশিয়াদের ওপর হামলা চালিয়েছে। রিয়াদের ধারণা, সৌদি আরবে ড্রোন হামলার পেছনে এই গোষ্ঠীগুলোর হাত রয়েছে। এখন সৌদি আরবের সামনে বড় প্রশ্ন হলো, তারা কি পাল্টা হামলার মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে, নাকি পরিস্থিতি শান্ত করতে কোনো আর্থিক সমঝোতার পথ বেছে নেবে?
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতে মূলত দুটি পক্ষ রয়েছে। একদিকে ইরান এবং তাদের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি), যাদের মিত্র হিসেবে ইয়েমেনের হুতিরা কাজ করছে, যারা ২০১৪ সালে দেশটির বড় একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এছাড়া ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসও তাদের মিত্র। অভিযোগ রয়েছে, এই আধাসামরিক বাহিনী সৌদি আরবের ওপর প্রায় ৩০টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। অন্যপক্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো। ইরান তাদের সাম্প্রতিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মূলত জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে কেন্দ্রিভূত করেছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উচ্চাভিলাষী ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবায়নের পথে এই সংঘাত বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আধুনিক শিল্প গড়ে তোলা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনার জন্য স্থিতিশীলতা জরুরি। কিন্তু হুতিদের ড্রোন কিংবা ইরান থেকে আসা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি এই পরিকল্পনাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে আবকাইক ও খুরাইসে তেল স্থাপনায় ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের হামলার পর থেকে রিয়াদ তাদের জাতীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বিগ্ন। গত সোমবারের স্যাটেলাইট ছবিতেও আবকাইক স্থাপনায় নতুন করে হামলার চিহ্ন পাওয়া গেছে।
তেল রপ্তানি সৌদি অর্থনীতির মূল ভিত্তি। ফেব্রুয়ারিতে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি শুরু করে। কিন্তু ১৩ জুলাই সানার বিমানবন্দরে সৌদি হামলার পর হুতিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। এতে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সাত বছর ধরে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেও সৌদি আরব সফল হয়নি, বরং এখন তারা উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় দিক থেকেই নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির মুখে পড়েছে। ২০২২ সালে সৌদি আরব হুতিদের সঙ্গে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। ভিশন ২০৩০-এর পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় এমন পরিস্থিতির কথা কেউ কল্পনাও করেনি।





