মহাবিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টি তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বাহ্যিক বিভিন্ন উপাদানের ওপর নির্ভরশীল, যাকে ইসলামি পরিভাষায় ‘রিজিক’ বলা হয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে মানুষ তার মেধা ও শ্রম দিয়ে রিজিক উপার্জন করছে, কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় যে মানুষের এই প্রচেষ্টা কেবল একটি বাহ্যিক মাধ্যম মাত্র। রিজিকের আসল উৎস এবং চালিকাশক্তি হলো আল্লাহ। যদি মানুষের নিজস্ব স্বাধীন ক্ষমতা থাকত, তবে কোনো পরিশ্রমই কখনো বৃথা যেত না।
উদাহরণস্বরূপ, একজন কৃষক জমিতে বীজ বপন করেন, কিন্তু সেই নিষ্প্রাণ বীজে প্রাণ সঞ্চার করা, চারাগাছে রূপান্তর এবং ফলের জিনগত কোড সক্রিয় করার মতো জটিল প্রক্রিয়ায় কৃষকের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সালোকসংশ্লেষণ বা প্রাকৃতিক জলবায়ুর মতো মহাজাগতিক ব্যবস্থাগুলো মানুষ তৈরি করেনি। অনেক সময় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কঠোর পরিশ্রম করেও সফলতা আসে না, আবার কখনো সামান্য শ্রমেই প্রচুর প্রাপ্তি ঘটে। এই অনিশ্চিত বিষয়গুলো প্রমাণ করে যে, রিজিকের প্রকৃত মালিক আল্লাহ। হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে আমার বান্দাগণ, আমি যাকে অন্ন দিয়েছি সে ছাড়া তোমরা সবাই ক্ষুধার্ত। সুতরাং তোমরা আমার কাছে খাদ্য চাও, আমি তোমাদের খাদ্য দেব’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৭৭)।
আল্লাহর রিজিকদাতা হওয়ার অন্যতম বড় প্রমাণ হলো এর সর্বজনীনতা। তিনি কেবল বিশ্বাসীদের নয়, বরং যারা তাকে অস্বীকার করে তাদেরও জীবনোপকরণ সরবরাহ করেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহ নেননি’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৬)। আধুনিক প্রযুক্তি বা নিখুঁত পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়া প্রমাণ করে যে, রিজিকের সমীকরণে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরের অনেক বিষয় রয়েছে।
যে ব্যক্তি নিজের সম্পদকে কেবল নিজের মেধা ও কৃতিত্বের ফল মনে করে, সে দার্শনিক বিভ্রান্তিতে ভোগে। কারণ, তার মেধা, শারীরিক সুস্থতা কিংবা সমাজব্যবস্থা—কোনোটিই তার নিজের সৃষ্টি নয়। পক্ষান্তরে, একজন মুমিন বিশ্বাস করে যে তার ক্ষুদ্রতম রিজিকটিও আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা নেয়ামত। এই বিশ্বাস তাকে উপার্জন এবং তা সঠিক পথে ব্যয়ের মাধ্যমে ইবাদতে লিপ্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে।
মানুষের একটি সাধারণ দুর্বলতা হলো অভাবের সময় অধৈর্য হয়ে পড়া। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘মানুষের অবস্থা এই যে যখন তার প্রতিপালক তাকে মর্যাদা ও অনুগ্রহ দান করেন, তখন সে বলে, আমার প্রতিপালক আমাকে সম্মানিত করেছেন। আর যখন তার রিজিক সংকুচিত করে দেন, তখন সে বলে, আমার প্রতিপালক আমাকে হেয় করেছেন’ (সুরা ফাজর, আয়াত: ১৫-১৬)। এটি একটি অপরিপক্ব মানসিকতা। প্রাচুর্য বা সংকট কোনোটিই সরাসরি আল্লাহর সন্তুষ্টি বা বিরাগের প্রমাণ নয়; বরং সংকট অনেক সময় একটি পরীক্ষা মাত্র। মারকাযু ফয়জিল কুরআন আল-ইসলামীর শিক্ষক মুফতি ইউসুফ এমদাদী বলেন, মানুষ রিজিকের সংগ্রাহক হতে পারে, কিন্তু স্রষ্টা নয়। এই সত্যটি উপলব্ধিতে এলে আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা বাড়ে, যা মুমিনের মানসিক প্রশান্তির মূল উৎস।




