সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের কালো দিবস: ১৬ জুন

প্রকাশ:

১৯৭৫ সালের ১৬ জুন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এই দিনে সদ্য স্বাধীন দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর আঘাত হানা হয়েছিল, যখন সব পত্রিকা বন্ধ করে মাত্র চারটি পত্রিকা সরকারের অধীনে রাখা হয়। এই ঘটনাটি ঘটেছিল একদলীয় বাকশাল শাসন কায়েমের মাত্র পাঁচ মাস পর।

এর আগে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যা বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী ছিল। ১৯৭১ সালে মানুষ বহু দলীয় গণতন্ত্রের জন্যই জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিল।

পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাকশালি শাসনের অবসান ঘটে। যদিও এই অবসান বেদনাদায়ক ছিল, তবে এটি জাতিকে একদলীয় শাসনের নিগড় থেকে মুক্তি দিয়েছিল। তবে এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সমাজে বিভক্তি এবং ঘৃণা-বিদ্বেষকে আরও তীব্র করে তোলে।

শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি পাকিস্তান আমলে গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন এবং বহুবার কারাবরণ করেছিলেন, তার স্বাধীন বাংলাদেশে এমন কাজ ইতিহাসে বিরল। অন্যদিকে, সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হয়ে একদলীয় বাকশালি শাসনের অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, যা সাধারণ সামরিক শাসকদের আচরণের বিপরীত।

স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশ প্রায় ৩০ বছর কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী শাসনের অধীনে ছিল। এর মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের নিবর্তনমূলক শাসন, জেনারেল এইচএম এরশাদের স্বৈরশাসন (১৯৮২-১৯৯০), জেনারেল মইন ইউ আহমেদের শাসন (২০০৭-২০০৮) এবং শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসন।

এই প্রেক্ষাপটে, বিগত ৫৫ বছরে বাংলাদেশের মানুষ কখনোই নিরবচ্ছিন্নভাবে গণতান্ত্রিক চর্চা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেনি, বরং তা কেবল মাঝেমধ্যে লাভ করেছে এবং আবার হারিয়েছে। এই পর্যায়ক্রমিক স্বাধীনতা হারানো ও প্রাপ্তির চক্র জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

এ বছর ১৬ জুন কালো দিবস পালনে একটি নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বর্তমান বিএনপি সরকার এই দিবস পালনে উদ্যোগী হয়েছে। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ১৫ জুন একটি সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেন। ‘ফ্যাসিবাদ মোকাবিলায় মিডিয়ার ব্যর্থতা’ শীর্ষক এই সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, যিনি নিজেও ফ্যাসিবাদের নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন।

অতীতে, সাংবাদিক ইউনিয়নের জাতীয়তাবাদী অংশটি প্রতি বছর ১৬ জুন কালো দিবস পালন করত, কিন্তু আওয়ামী লীগপন্থী অংশটি বিরত থাকত। ১৯৯৩ সালে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে সাংবাদিক ইউনিয়ন বিভক্ত হয়ে যাওয়ার পর থেকে এই বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরা এবং ২০০৯ সাল থেকে টানা ১৫ বছরের শাসনামলে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে যা নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছে। কিছু সাংবাদিক, যারা একসময় একদলীয় শাসন ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের সমর্থক ছিলেন, তারাই পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনকে স্থায়ী করার পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকার পর অনুকূল পরিবেশে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।

সুশাসন দিয়ে কুশাসনকে পরাজিত না করতে পারলে কুশাসন বারবার ফিরে আসবে। যতক্ষণ পর্যন্ত একটি সর্বসম্মত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মিত না হবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে না, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা নিশ্চিত হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশে আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্য সমাজ কেবল কল্পলোকেই বিরাজ করবে।

একবার ভেবে দেখুন, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৫৫ বছর হলো। এই সময়ের মধ্যে ৩০ বছরই দেশটি চরম কর্তৃত্ববাদী কিংবা ফ্যাসিবাদী শাসনে নিষ্পেষিত ছিল। যেমন স্বাধীনতার সূচনা লগ্নে মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সাড়ে তিন বছরের কঠিন নিবর্তনমূলক এবং পরিশেষে একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে জেনারেল এইচএম এরশাদের নেতৃত্বে স্বৈরশাসন। ২০০৭ সাল থেকে কার্যত জেনারেল মইন ইউ আহমেদের দুই বছরের এমন এক অভিসন্ধিমূলক শাসন, যা দীর্ঘমেয়াদি ফ্যাসিবাদী শাসনের গোড়াপত্তন ঘটিয়েছিল। আর সেই গোড়াপত্তনের পথ ধরে পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

শেয়ার করুন