নেপালে দ্বিতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা, সীমান্তে সতর্কতা জারি

প্রকাশ:

নেপালের রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে আরও বড় দুর্যোগের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তঃসরকারি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) সতর্ক করে বলেছে, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ভাটির দিকে পানির প্রবাহ আটকে থাকা একটি অংশ এখনো পুরোপুরি সরে যায়নি। যদি সেই বাধা ভেঙে যায়, তবে দ্বিতীয় দফায় প্রবল বন্যার ঢল নামতে পারে। সংস্থাটি হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের আট দেশ—বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, পাকিস্তান, মিয়ানমার ও আফগানিস্তান নিয়ে কাজ করে থাকে।

আইসিআইএমওডির বিবৃতি অনুযায়ী, গত ২৬ আগস্ট স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে ভোতে কোশি অববাহিকায় হঠাৎ পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিপুল পরিমাণ পানি, পলি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার দিকে নেমে আসে। নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধির হার পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে তুলে ধরেছে। ত্রিশূলী নদীর গালচি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার এবং মালেখু এলাকায় প্রায় ৭ মিটার বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এত দ্রুত পানি বৃদ্ধি উজান থেকে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষসহ পানির হঠাৎ নেমে আসার ইঙ্গিত দেয়।

আইসিআইএমওডির জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়্যাংগং ঝাং জানান, গত বছরের বন্যায় বিধ্বস্ত এলাকাটি আবারও নতুন করে ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, উচ্চ পার্বত্য এলাকায় বড় ধরনের বরফ ও পাথরের ধস নেমে লহেন্দে খোলা নদীতে পড়ার ফলে এই বন্যার সৃষ্টি হতে পারে। আরেকটি আশঙ্কার কারণ হলো, ধসের ফলে নদীর সরু অংশে সাময়িকভাবে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বাঁধ। এই বাঁধের পেছনে পানি জমতে থাকলে সেটি যেকোনো সময় ভেঙে আরও শক্তিশালী বন্যার ঢেউ সৃষ্টি করতে পারে। বর্তমানে উজানে এমন কোনো বাধা রয়ে গেছে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন।

বন্যার সময় জিলং ও ঝাংমু এলাকার পর্যবেক্ষণকেন্দ্রগুলো থেকে অস্বাভাবিক ভূকম্পন সংকেত রেকর্ড করা হয়েছে। এগুলো বরফধস বা ভূমিধস থেকে সৃষ্টি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে বন্যার সঙ্গে এই সংকেতের সরাসরি সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত নয়। সংস্থাটির দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল একে 'ক্যাসকেডিং হ্যাজার্ড' হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে হিমবাহের কোনো ঘটনা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জনবসতিতে দুর্যোগ ডেকে আনতে পারে। জ্যেষ্ঠ ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফারুক আজম হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা জলবিদ্যুৎ-সংক্রান্ত তথ্য, ভূকম্পন সংকেত ও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য বাধাটির স্থিতিশীলতা যাচাই করছেন। বন্যার প্রভাব রাসুয়া জেলা ছাপিয়ে নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। জিলং বন্দরের আশপাশের বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এই নির্দিষ্ট বন্যার সরাসরি সম্পর্ক এখনো প্রমাণিত নয়, তবুও পুরো হিমালয় অঞ্চলে ঝুঁকি বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

জিলংয়ের একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র, যা দুর্গত এলাকা থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে, এবং ঝাংমু এলাকার আরেকটি কেন্দ্র থেকে অস্বাভাবিক সংকেত পাওয়া যায়।

সর্বশেষ বন্যায় অবকাঠামো ও পানি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নদী উপত্যকার বিভিন্ন জনবসতি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।আইসিআইএমওডির দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল বলেন, লহেন্দে খোলা ১৪ মাসের মধ্যে দুবার বন্যার কবলে পড়েছে।

শেয়ার করুন