মিয়ানমারের গভীর জঙ্গলে বিপ্লবের লাল পতাকাকে স্যালুট জানিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের শপথ নিচ্ছেন পিছু হটতে থাকা বিদ্রোহীরা। তবে পাঁচ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর এই আন্দোলনের তেজ অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে। সাগাইং অঞ্চলের একটি গোপন প্রশিক্ষণ ঘাঁটিতে অবস্থানরত ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্স’ (পিডিএফ)-এর ২৩ বছর বয়সী এক সেকশন কমান্ডার, যিনি নিরাপত্তার খাতিরে নিজেকে ‘ভিলেন’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, জানান যে বিপ্লব এখন দীর্ঘমেয়াদী রূপ নিয়েছে। তাঁর মতে, নতুন যোদ্ধাদের মধ্যেও এই আন্দোলনের সাফল্য নিয়ে সংশয় ও অনিশ্চয়তা দানা বাঁধছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এসিএলইডির তথ্যমতে এ পর্যন্ত এক লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
একসময় বিদ্রোহীরা সামরিক জান্তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে রণক্ষেত্রের চিত্র বদলেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে চীনের কৌশলগত সমর্থন বড় ভূমিকা রাখছে। বেইজিং পিডিএফ-এর সাথে জোটবদ্ধ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাথে জান্তা সরকারের যুদ্ধবিরতি স্থাপনে মধ্যস্থতা করেছে এবং জান্তার নতুন বেসামরিক প্রশাসনকে সমর্থন দিচ্ছে। এর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে মিয়ানমারের একঘরে ভাবমূর্তি পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। এই সপ্তাহান্তে ব্যাংককে আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
নির্বাসিত ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট’ (এনইউজি)-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিন মার অং স্বীকার করেছেন যে, জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন হারানো তাদের জন্য বড় ধাক্কা। তিনি বলেন, একা লড়াইয়ে জয় পাওয়া অসম্ভব। অতীতে তরুণ পিডিএফ গেরিলারা পেশাদার জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীদের সাথে হাত মিলিয়ে ২০২৩ সালে মান্দালয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। তবে চীনের সহায়তায় জান্তা সরকার মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) এবং তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (টিএনএলএ) সাথে যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে দক্ষ মিত্রদের হারিয়ে পিডিএফ যোদ্ধারা বর্তমানে অস্ত্র ও গোলাবারুদের সংকটে পিছু হটছেন।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক মর্গান মাইকেলসের মতে, সশস্ত্র বাহিনীর কাছে পিডিএফ যোদ্ধারা এখন কেবলই বিরক্তির কারণ। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেন, জাতিগত সমর্থন ছাড়া অসংগঠিত এই যোদ্ধারা হয় যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য হবেন, নতুবা আঞ্চলিক যুদ্ধবাজ হিসেবে পরিচিত হবেন অথবা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন। বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্তে অস্থিরতা নিরসনে চীন এই যুদ্ধবিরতি করিয়েছে। জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং নির্বাচনের মাধ্যমে বেসামরিক শাসনে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিলে চীন তাকে পূর্ণ সমর্থন দেয়। যদিও গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উপহাস হিসেবে দেখছেন, তবুও মিন অং হ্লাইং ভারত, লাওস ও চীন থেকে লালগালিচা সংবর্ধনা পাচ্ছেন।
জিন মার অং মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক অচলাবস্থায় হতাশ হয়েই জান্তার সাথে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রণক্ষেত্রে ঐক্য ও শক্তি প্রমাণ করতে পারলে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই পরিবর্তিত হবে। তবে বিশ্লেষক মাইকেলসের মতে, জান্তা প্রশাসন বর্তমানে শান্তি পরিকল্পনা, সু চিকে গৃহবন্দী করা এবং যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে একটি গ্রহণযোগ্য পথ তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে, যা বিদ্রোহীদের আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতাকে সংকুচিত করে আনছে।





