মৌলভীবাজারের মনু নদীর পাড়ে বেড়ে ওঠা মনু মিয়ার মেজাজ-মর্জি ও জীবনভাবনা বয়স বাড়ার সাথে সাথে দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তার ঝুলিকে সমৃদ্ধ করলেও বার্ধক্যের কারণে চোখ, কান ও হৃদয়ের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা তৈরি হচ্ছে। ইহকাল ও পরকাল নিয়ে তার ভেতরের উপলব্ধি যত গভীর হচ্ছে, ততই তিনি নিজেকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে শুরু করেছেন। একজন সাধারণ অজ্ঞ মানুষের কাজের পরিধি আর নিজের মতো শিক্ষিত মানুষের দায়িত্বের ভিন্নতা এখন তিনি গভীরভাবে অনুভব করছেন। মনু মিয়া বুঝতে পেরেছেন যে, জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে তার ওপর সামাজিক ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতা অনেক বেড়ে গেছে, কারণ চোখ থাকতে অন্ধ সেজে থাকা যায় না।
প্রতিনিয়ত ঠেকে শেখা মনু মিয়া যখন তার অর্জিত নীতিজ্ঞান ও আদর্শ সমাজে প্রয়োগ করতে যান, তখন তাকে নানামুখী বাধার মুখোমুখি হতে হয়। সমাজে ভালো কাজের উদ্যোগ নিলে একদল মানুষ ঔদ্ধত্য দেখিয়ে তাকে দূরে সরে যেতে বলে। সৎ ও সুন্দর মূল্যবোধগুলো আজ চরম অবক্ষয়ের শিকার। সুশাসন ও সুনীতির জায়গায় দুর্নীতি জেঁকে বসেছে, আর সততার ধারণাকে বিতর্কিত করা হচ্ছে। একটি রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের পরেও মানুষের পুরনো বদভ্যাসগুলো দূর হয়নি, বরং অর্থনৈতিক সক্ষমতা আরও হ্রাস পেয়েছে। বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার যে সংগ্রাম তরুণরা করেছিল, সেখানে মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষতার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্নীতি ও প্রতারণার কারণে সেই অর্জনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
আবহমান বাংলার বর্ষা আর টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ একসময় মনু মিয়াকে আবেগাপ্লুত করত। কিন্তু জীবনের এই পর্যায়ে এসে বৃষ্টি তার কাছে এক বড় আপদ মনে হয়। পরিবারসহ জাপানে কাটানো ছয়টি বছরের যান্ত্রিক ও মায়াহীন বৃষ্টির স্মৃতি তাকে তাড়া করে। এখন দেশের বৃষ্টিও তার মনে কোনো নতুন সুর তোলে না, বরং জলাবদ্ধতা আর দুর্গন্ধের যন্ত্রণাই মনে করিয়ে দেয়। আধুনিক গান বা সুরের মধ্যেও তিনি আর আগের মতো মেলোডি খুঁজে পান না। অতৃপ্ত মনু মিয়ার মনোজগতে এখন কেবল ফরিদা পারভীনের গান কিংবা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া অন্য কিছু দাগ কাটে না। তবে মসজিদের ইমামের খালি গলার পবিত্র তিলাওয়াত তাকে ঐশ্বরিক ভাবনায় আচ্ছন্ন করে তোলে, যা অতীতে কখনো এভাবে ঘটেনি।
কর্মজীবনে মনু মিয়া কখনো কারও ক্ষতি করেননি। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গিয়ে সহকর্মীদের সাথে সামান্য মনোমালিন্য হলেও, পরে যখন দেখেন অন্যরা প্ররোচিত হয়ে তার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছে, তখন তিনি নিজের মনে তীব্র বেদনা অনুভব করেন। এই মানসিক কষ্টের মুহূর্তে তিনি সান্ত্বনা ও সঠিক পথের দিশা খুঁজে পান সাধক ব্যক্তিত্ব খানবাহাদুর আহছানউল্লাহর ভক্তদের উদ্দেশে লেখা কিছু চিঠির বাণীতে।
সেই আধ্যাত্মিক বাণীতে বলা হয়েছে, আল্লাহর অফুরন্ত নিয়ামতের জন্য সর্বদা কৃতজ্ঞ থাকা এবং প্রতিটি নিশ্বাসে তাকে স্মরণ করাই মানুষের একমাত্র কর্তব্য। যৌবনের প্রবৃত্তি যখন মানুষকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করতে চায়, তখন নিভৃতে স্রষ্টার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে হবে। মানুষের সহানুভূতি না পেলেও বন্য জীবের সখ্যতা বা প্রকৃতির মাঝে স্রষ্টাকে খোঁজার সাধনা করা উচিত। চিঠিতে অহংকার ও হিংসা পরিহার করে পারস্পরিক ভালোবাসার মাধ্যমে সমাজকে স্বর্গীয় শান্তিতে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
খানবাহাদুর আহছানউল্লাহর উপদেশ অনুসারে, কথাবার্তায় নম্রতা বজায় রাখা মহত্ত্বের লক্ষণ। মানুষের মন যত নরম হবে, তার ভাষার কর্কশতা তত কমে আসবে। নামাজ পড়েও যদি কেউ রুক্ষভাষী হয়, অন্যকে হেয় করে এবং ক্রোধ ও মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তবে তা চরম কলঙ্কের বিষয়। নিজের মধ্যকার দুষ্প্রবৃত্তিকে দমন করে, অন্যের দোষ অনুসন্ধান না করে এবং সর্বদা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করাই প্রকৃত মানুষের পরিচয়। অভাব, দারিদ্র্য ও মুসিবতকে হাসিমুখে মেনে নিয়ে স্রষ্টার ওপর পূর্ণ ভরসা রাখলেই অন্তরে প্রকৃত শান্তি লাভ করা সম্ভব।





