চলতি বিশ্বকাপের শেষ ৩২–এর ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ৩–২ গোলের কঠিন জয় পেয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আটলান্টিক মহাসাগরের বুক থেকে উঠে আসা পুঁচকে এই দলটি ১২০ মিনিট ধরে মেসিদের যেভাবে তটস্থ রেখেছিল, তাতে শেষ বাঁশির পর আর্জেন্টাইনদের উদ্যাপন দেখে যে কেউ চমকে যেতে পারেন—যেন ট্রফি ধরে রাখার অভিযানে আসা একটি দল শেষ ৩২–এর ম্যাচ জিতেই এত খুশি!
শক্তিমত্তায় ও সাফল্যে দুই দলের বিশাল ব্যবধানের কারণে এই ম্যাচকে কেউ কেউ বিশ্বকাপ নকআউটের সবচেয়ে বড় ‘মিস ম্যাচ’ কি না প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দে এটিকেই ‘বিগ ম্যাচ’ বানিয়ে তুলল তাদের অবিশ্বাস্য লড়াই দিয়ে।
ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটে আর্জেন্টিনা গোলমুখে একটি শট নিলেও পরের আধা ঘণ্টায় কোনো শটই নিতে পারেনি কেপ ভার্দে। বরং ২৯তম মিনিটে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন লিওনেল মেসি। লিসান্দ্রো মার্তিনেসের লম্বা পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দ্বিতীয় স্পর্শেই গোলকিপার ভোজিনিয়ার ওপর দিয়ে বল তুলে দেন জালে। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল তাঁর সপ্তম গোল এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ২০তম। টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এরপরই শুরু হয় কেপ ভার্দের প্রতিরোধ–পর্ব। প্রথমার্ধের বিরতির আগে এনজো ফার্নান্দেজ ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেলেও ভোজিনিয়া দারুণ এক সেভে কেপ ভার্দেকে ম্যাচে রাখেন।
বিরতির পর আক্রমণে সাহসী হয়ে ওঠে কেপ ভার্দে। দেরয় দুয়ার্তের জোরালো শট এমিলিয়ানো মার্তিনেজ না ঠেকালে ৫৪ মিনিটেই দলটি গোল পেয়ে যেতে পারত। তবে পাঁচ মিনিট পর আর রক্ষা হয়নি। রায়ান মেন্দেসের কাটব্যাক থেকে দুরূহ কোণ থেকে নেওয়া শটে আর্জেন্টিনার জালে বল জড়ান দুয়ার্তে, স্কোরলাইন হয় ১–১।
গোল হজম করার পর যেন অস্থিরই হয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। কোচ স্কালোনি একে একে মাঠে নামান হুলিয়ান আলভারেজ, নিকোলাস গনসালেস, লিয়ান্দ্রো পারেদেসদের। মেসিও একের পর এক সুযোগ তৈরি করেন। ৬২ মিনিটে ভোজিনিয়া তাঁর সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান। ৭২ মিনিটে মেসির দুর্দান্ত ফ্রি-কিকও কর্নারের বিনিময়ে প্রতিহত করেন ৪০ বছর বয়সী এই গোলকিপার। শেষ দিকে মেসির আরেকটি ফ্রি-কিক এবং পারেদেসের দূরপাল্লার শটও ঠেকিয়ে দেন তিনি। ৯০ মিনিটের খেলা ১–১ সমতায় থাকায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটেই আবার এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কর্নার থেকে আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারের ফ্লিকে বল পেয়ে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে জাল খুঁজে নেন লিসান্রো মার্তিনেস। কিন্তু কেপ ভার্দে যে হার মানার দল নয়, তা আবারও প্রমাণ করে। ১০৩ মিনিটে বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের দুর্দান্ত বাঁকানো শটে বল জড়ান সিডনি কাবরাল। এমি মার্তিনেজের কিছুই করার ছিল না। টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোলের দাবিদার এই গোল আবারও স্তব্ধ করে দেয় আর্জেন্টিনাকে, স্কোরলাইন হয় ২–২।
ম্যাচ তখন টাইব্রেকারের দিকেই এগোচ্ছিল। তবে ১১১ মিনিটে আসে কেপ ভার্দের ‘নিষ্ঠুর মুহূর্ত’। মেসির কর্নার থেকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড বোর্জেসের হাতে লেগে খানিকটা দিক পাল্টে জড়িয়ে যায় জালে। আত্মঘাতী এই গোলেই ভেঙে যায় কেপ ভার্দের স্বপ্ন, আর্জেন্টিনা এগিয়ে যায় ৩–২ ব্যবধানে।
তবু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই ছাড়েনি আফ্রিকার দলটি। ১১৬ মিনিটে কাবরালের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক এমি মার্তিনেজ আঙুলের ডগায় ছুঁয়ে কর্নারের বিনিময়ে ঠেকান। ১১৯ মিনিটে গিলসন বেঞ্চিমোলের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আরেকটি নিশ্চিত গোল বাঁচান আর্জেন্টাইন গোলকিপার। যোগ করা সময়ে পাল্টা আক্রমণে আলভারেজের জন্য সুযোগও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু সেটি কাজে লাগাতে পারেননি তিনি।
শেষ পর্যন্ত ৩–২ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা। তবে স্কোরলাইন যতই তাদের পক্ষে থাকুক, এই ম্যাচ মনে রাখা হবে কেপ ভার্দের জন্যই। গ্রুপ পর্বে স্পেন ও উরুগুয়ের সঙ্গে ড্র করে আসা দলটি আজ আরেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে ৯০ মিনিটে জিততে দেয়নি। কেপ ভার্দের এমন লড়াই বহুদিন মনে থাকার কথা মেসি-স্কালোনিদেরও। এমন কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি যে আর্জেন্টিনা অনেক দিন হয়নি! শেষ ষোলোর ম্যাচে ৭ জুলাই আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ মিসর।





