বাংলাদেশের মানুষ অতীতের সেই শাসনব্যবস্থায় আর ফিরে যেতে চায় না, যেখানে ব্যক্তি আইনের ঊর্ধ্বে ছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল দাবি ছিল এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকবে, প্রশাসন হবে নিরপেক্ষ এবং নির্বাচন হবে জনগণের অবাধ মতপ্রকাশের উৎসব। গুম, নির্যাতন, দখলবাজি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত একটি রাষ্ট্র গঠনই ছিল জুলাইয়ের স্বপ্ন। তবে আজ প্রশ্ন উঠছে, সেই ঐতিহাসিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে সরকার কতদূর এগিয়েছে? সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে সংস্কারের দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় নানা মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জ্যাঁ জাক রুশোর মতে, সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের ইচ্ছার মধ্যেই নিহিত। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা যখন বাস্তব নীতিতে প্রতিফলিত হয় না, তখন হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে ৩১ দফার মাধ্যমে সংবিধান ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলে এসেছে। সরকার গঠনের পর এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত গতি দেখা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট যেমনটি লিখেছিলেন, ক্ষমতার আসল শক্তি মানুষের সম্মিলিত সম্মতিতে, সেই সম্মতিই দুর্বল হয় যখন ঘোষিত লক্ষ্য ও বাস্তব কাজের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়।
বর্তমানে সংসদের আলোচনা ও টকশোতে রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। বিএনপির কোনো কোনো এমপি জুলাই বিপ্লবকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন এবং হাসিনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করছেন। এই ধরনের বক্তব্য ফ্যাসিস্টদের দোসরদের উৎসাহিত করছে, যারা প্রফেসর ইউনূস, জামায়াত ও এনসিপিকে টার্গেট করছে। অবাক করার বিষয় হলো সরকারি দল বিএনপির নেতারাও হাসিনার অপশাসন নিয়ে আর সরব নন। তারা যেন হাসিনা সরকারের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর পথ বেছে নিয়েছে। ইনু তার বক্তৃতায় সবসময় জামায়াত ও বিএনপির বিরুদ্ধে বিষোদগার করতেন। খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান ছিল তার আক্রমণের মূল টার্গেট। আর সংগঠন হিসেবে জামায়াতকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ১০ জনই মনে করেন, এই প্রবণতা জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনার পরিপন্থী।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি ও ড্যানিয়েল জিবলাট দেখিয়েছেন, গণতন্ত্র তখনই দুর্বল হয় যখন প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিএনপি দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে, তাই তাদের প্রতি জনগণের প্রত্যাশাও বেশি। এখন সংবিধান সংস্কার পরিষদ, বিচার বিভাগের কাঠামোগত স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার রোডম্যাপ পরিষ্কার করা জরুরি।
সরকারের সামনে এখনো সুযোগ রয়েছে নির্বাচনী অঙ্গীকার ও জুলাইয়ের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার চেয়ে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যা সব দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত বিজয় তখনই অর্জিত হবে, যখন রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, বরং জনগণের হবে।





