ভূগোলের আশীর্বাদ ও অভিশাপ: মধ্যপ্রাচ্যে জর্দানের টিকে থাকার কৌশল

প্রকাশ:

মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শুধু ওয়াশিংটনের বন্ধু হয়ে টিকে থাকা জর্দানের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। মাত্র এক কোটির কিছু বেশি জনসংখ্যার এই দেশটি তেলসমৃদ্ধ নয়, আবার বড় কোনো সামরিক শক্তিরও মালিক নয়। তা সত্ত্বেও, ওয়াশিংটন, তেল আবিব, রিয়াদ, ব্রাসেলস কিংবা লন্ডনের নিরাপত্তা টেবিলে জর্দানের নাম সব সময়ই আলোচনার শীর্ষে থাকে। এর কারণ স্পষ্ট—মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাষ্ট্র তার ‘শক্তির’ কারণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, জর্দান গুরুত্বপূর্ণ তার ‘অবস্থানের’ কারণে। এই ভূগোলই তাকে একই সঙ্গে আশীর্বাদ দিয়েছে, আবার অভিশাপের মুখেও ফেলেছে। জর্দানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক শক্তির খেলায় নিজেকে বিকিয়ে না দিয়ে কতটা দক্ষতার সাথে সে নিজের অর্থনীতি, সামাজিক সংহতি এবং সার্বভৌমত্বের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে, তার ওপর। কারণ জর্দানের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে, ভূগোল কখনো রাজনীতির চেয়েও বেশি শক্তিশালী।

সম্প্রতি ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক ব্রুস রিডেল তার ‘Why Jordan Remains a Critical U.S. Partner’ শীর্ষক নিবন্ধে যুক্তি দিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এবং বর্তমান আঞ্চলিক অস্থিরতায় জর্দান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, জর্দান শুধু মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও গোয়েন্দা সহযোগিতার কেন্দ্র নয়, এটি ইসরাইলের নিরাপত্তাকাঠামোরও এক অপরিহার্য স্তম্ভ। রিডেলের এই বিশ্লেষণ অমূলক নয়, কারণ গত সাত দশকে আম্মান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম স্থিতিশীল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে পরিণত হয়েছে। ১৯৯৪ সালের জর্দান-ইসরাইল শান্তিচুক্তি, আল-কায়েদা ও আইএসবিরোধী অভিযান কিংবা সিরিয়া-ইরাক সংকট—সব মিলিয়ে জর্দান ওয়াশিংটনের এক পরম অনুগত অংশীদার।

তবে রিডেলের বিশ্লেষণে একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মার্কিন নিরাপত্তা চশমায় দেখতে গিয়ে জর্দানের নিজস্ব রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, সামাজিক চাপ এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে দেশটির স্পর্শকাতর অবস্থান আড়ালেই রাখা হয়েছে। একটি দেশের গুরুত্ব তো কেবল অন্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা মেটানোর দায় দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না; তার নিজের টিকে থাকা এবং স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নও তো সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তার ‘Diplomacy’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আসে ‘শক্তির ভারসাম্য’ থেকে—কেবল সামরিক আধিপত্য থেকে নয়। জর্দান ঠিক সেই ভারসাম্যেরই একটি নীরব উপাদান। স্টিফেন ওয়াল্টের ‘Balance of Threat’ তত্ত্বও একই কথা মনে করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্রগুলো শুধু শক্তির বিরুদ্ধে নয়, সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধেও জোটে বাঁধে। জর্দানও একদিকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে নিজের দেশের ফিলিস্তিনপন্থী জনমতের চাপও তাকে সামলাতে হয়।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটে জন্ম নেয়া ট্রান্সজর্দান আজ এক বিরল দৃষ্টান্ত। মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিতিশীলতার মধ্যেও প্রায় এক শতাব্দী ধরে হাশেমি রাজতন্ত্র টিকে রয়েছে। ১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, ১৯৭০ সালের রক্তক্ষয়ী ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’, ইরান-ইরাক যুদ্ধ, উপসাগরীয় সংকট, আরব বসন্ত, আইএসের উত্থান কিংবা সাম্প্রতিক ইরান-ইসরাইল সংঘাত—সব ঝড় অতিক্রম করেও রাষ্ট্রটি ভেঙে পড়েনি। এই অবিশ্বাস্য স্থিতিশীলতার রহস্য তিনটি প্রধান কারণের ওপর নির্ভরশীল: প্রথমত, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বৈধতা, যেখানে হাশেমি রাজপরিবার নিজেদের কেবল রাজনৈতিক শাসক নয়, ঐতিহাসিক বৈধতার ধারক মনে করে। দ্বিতীয়ত, পেশাদার নিরাপত্তা বাহিনী, যার কাঠামো অত্যন্ত দক্ষ ও পেশাদার। এবং তৃতীয়ত, বাস্তবমুখী পররাষ্ট্রনীতি, যা অন্ধ আদর্শের চেয়ে বাস্তববাদকে (কেউ সুবিধাবাদও বলতে পারেন) বেছে নেয়। এর ফলস্বরূপ, দেশটি একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত মিত্র, উপসাগরীয় আরবদের বন্ধু এবং ফিলিস্তিনি অধিকারের দৃশ্যত জোরালো সমর্থক হিসেবে পরিচিত।

জর্দান মূলত মধ্যপ্রাচ্যের এক ‘ভূ-রাজনৈতিক সংযোগবিন্দু’। পশ্চিমে ইসরাইল ও পশ্চিমতীর, উত্তরে সিরিয়া, পূর্বে ইরাক এবং দক্ষিণে সৌদি আরব—এই চার বিপরীতমুখী নিরাপত্তা পরিমণ্ডলের কেন্দ্রে এর অবস্থান। তাই ওয়াশিংটনের কাছে এটি সামরিক লজিস্টিকস কেন্দ্র, ইসরাইলের কাছে কৌশলগত ‘বাফার জোন’, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য স্থলাঞ্চলের করিডোর, আর ইউরোপের কাছে শরণার্থী ও সন্ত্রাসবাদ ঠেকানোর দেয়াল হিসেবে কাজ করে।

তবে নিরাপত্তা সহযোগিতার এই চাকচিক্যের পেছনে জর্দানের ভেতরটা কিন্তু মারাত্মকভাবে ভঙ্গুর। মূলত সাতটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটের ওপর দাঁড়িয়ে আছে দেশটি: ১. তীব্র পানিসঙ্কট, যা জর্দানকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান পানি-সঙ্কটাপন্ন দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীগুলোর ওপর অনির্ভরশীলতা এটিকে জাতীয় নিরাপত্তার হুমকিতে পরিণত করেছে। ২. পরনির্ভরশীল অর্থনীতি, যেখানে মার্কিন ও ইউরোপীয় সহায়তার ওপর ভারী নির্ভরতা জর্দানের সার্বভৌম নীতি গ্রহণের ক্ষমতাকে সঙ্কুচিত করে। ৩. শরণার্থীর অভয়ারণ্য, যেখানে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের পাশাপাশি সিরীয় শরণার্থীদের বিশাল চাপ দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোকে পিষে ফেলছে। ৪. বেকারত্ব ও তরুণদের হতাশা, যা কর্মসংস্থান না থাকায় তরুণ সমাজের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তৈরি করছে এবং যেকোনো সময় সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। ৫. জনমত ও রাষ্ট্রনীতির দ্বন্দ্ব, কারণ জর্দানের জনসংখ্যার বড় অংশ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত। গাজা বা পশ্চিম তীরে ইসরাইলি তাণ্ডব বাড়লে আম্মানের রাস্তায় ক্ষোভ ফেটে পড়ে, ফলে সরকারের পক্ষে ইসরাইলের সাথে গোপন বা প্রকাশ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ৬. পরোক্ষ যুদ্ধের ঝুঁকি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নিরাপত্তা ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার খেসারত জর্দানকে দিতে হতে পারে কোনো বড় আঞ্চলিক সংঘাত শুরু হলে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক তাত্ত্বিক জন মিয়ারশাইমারের ‘Offensive Realism’ অনুযায়ী, পরাশক্তিগুলো কেবল তাদের স্বার্থই উদ্ধার করবে। ব্রুকিংসের নিবন্ধে জর্দানকে সেভাবেই একটি ‘কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু আম্মানের দৃষ্টিকোণ থেকে সংকটটি ভিন্ন। মার্কিন ঘাঁটির কারণে আম্মান হয়তো আজ নিরাপদ, কিন্তু ইরান-ইসরাইল পুরোদমে যুদ্ধ বাধলে এই ভূগোলই জর্দানকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে। ভবিষ্যতে জর্দানের সামনে বেশ কয়েকটি কঠিন পথ খোলা রয়েছে: প্রথমত, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে অভ্যন্তরীণ জনমত সামাল দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, ইরান ও ইসরাইলের ছায়াযুদ্ধে জর্দানের আকাশসীমা বারবার লঙ্ঘিত হলে দেশটি অনিচ্ছাসত্ত্বেও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। তৃতীয়ত, যদি দেশটি পানি ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি বৈচিত্র্য ও তরুণদের কর্মসংস্থানে সফল হয়, তবেই সে নিজের নিরাপত্তা পুরোপুরি নিজের হাতে নিতে পারবে; নয়তো অন্য দেশের কৃপা ও সহায়তার ওপরই নির্ভর করে থাকতে হবে।

জর্দানের প্রকৃত শক্তি তার সেনাবাহিনীর আকারে নয়, তার কূটনৈতিক অভিযোজন ক্ষমতায়। তার সবচেয়ে বড় সম্পদ তেলের খনিতে নয়, তার ভূগোলে; আবার দুঃখজনকভাবে তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও সেই ভূগোলই। গত এক শতাব্দীতে হাশেমি রাজতন্ত্র টিকে গেছে, কারণ তারা জানে যে, মধ্যপ্রাচ্যে বেঁচে থাকতে হলে সবসময় ‘সব পক্ষের কাছেই প্রয়োজনীয়’ হয়ে থাকতে হয়। তবে সামনের দশকটি এতটা সহজ হবে না।

শেয়ার করুন