মানবজাতির হেদায়াতের জন্য আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক নবী-রাসুলকে কিতাব দিয়েছেন এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে দিয়েছেন পবিত্র কোরআন। এটি মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান, যা ভাষা, অলংকার, ছন্দ ও ভাবের গভীরতায় অতুলনীয়। এই কিতাবে সব বিষয়ের সমাধান রয়েছে, বিশেষ করে উত্তরাধিকার আইন বা ফারায়েজ নিয়ে কোরআনে বিস্তারিতভাবে সবকিছু বলা হয়েছে। ফারায়েজ আইনের প্রথম ও প্রধান উৎস কোরআন। সুরা নিসার সপ্তম, একাদশ, দ্বাদশ এবং একশ ছিয়াত্তরতম আয়াতে উত্তরাধিকার আইন প্রত্যক্ষভাবে বিধৃত হয়েছে। মূলত ওহুদ যুদ্ধের পর, যেখানে সত্তরজন মুসলিম শহীদ হন, তখন বহু পরিবারের সামনে উত্তরাধিকার বণ্টনের প্রশ্নটি প্রকট হয়ে ওঠে এবং এই আয়াতগুলো নাজিল হয়।
পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, বাবা-মা এবং আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে, তা অল্পই হোক অথবা বেশিই হোক, এক নির্ধারিত অংশ (সুরা নিসা, আয়াত: ৭)। এই আয়াতটি তৎকালীন আরবে প্রচলিত নারীদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার নিষ্ঠুর কুপ্রথার বিরুদ্ধে একটি কঠিন প্রতিবাদ। এখানে 'ওয়ালিদান' শব্দ দ্বারা বাবা-মা ও সন্তানদের সম্পর্ক এবং 'আকরাবুন' শব্দ দ্বারা নিকটতম আত্মীয়দের বোঝানো হয়েছে। এই আয়াত ইঙ্গিত দেয় যে, নিকট ও দূরের সম্পর্ক একত্রিত হলে নিকটাত্মীয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং নিকট-আত্মীয় বিদ্যমান থাকলে দূরবর্তী আত্মীয় বঞ্চিত হবে। এখানে বর্ণিত অংশসমূহ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এবং নারী ও পুরুষের হক যে স্বতন্ত্র, তা এই বর্ণনাভঙ্গিতে স্পষ্ট।
আউস ইবনে সাবেত স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক অপ্রাপ্তবয়ষ্ক ছেলে রেখে মারা যান। প্রচলিত আইন অনুযায়ী স্ত্রী ও মেয়েরা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। আউসের স্ত্রী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করলে সুরা নিসার ১১ নম্বর আয়াত অবতীর্ণ হয়। এতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তোমাদের সন্তান সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক ছেলের অংশ দুই মেয়ের অংশের সমান। কিন্তু দুইয়ের অধিক মেয়ে থাকলে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ। মাত্র এক মেয়ে থাকলে তার জন্য অর্ধাংশ। তার সন্তান থাকলে বাবা-মা প্রত্যেকে এক-ষষ্ঠাংশ পাবে। সে নিঃসন্তান হলে এবং শুধু বাবা-মা উত্তরাধিকারী হলে মায়ের জন্য এক-তৃতীয়াংশ, আর ভাইবোন থাকলে মায়ের জন্য এক-ষষ্ঠাংশ। এসবই ওসিয়ত ও ঋণ পরিশোধের পর কার্যকর হবে।
হাদিসে জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, সাদ বিন রাবির দুই মেয়ে ও তাদের মা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করেন যে, তাদের জেঠা তাদের সম্পত্তি অধিকার করে নিয়েছে। মহানবী (সা.) তখন তাদের জেঠাকে ডেকে সাদের দুই মেয়েকে দুই-তৃতীয়াংশ এবং তাদের মাকে এক-অষ্টমাংশ দেওয়ার নির্দেশ দেন (মুসনাদে আহমাদ)। সুরা নিসার ১২ নম্বর আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর অংশ বর্ণিত হয়েছে। মৃত স্ত্রীর সন্তান না থাকলে স্বামী অর্ধেক পাবে, সন্তান থাকলে এক-চতুর্থাংশ পাবে। একইভাবে স্ত্রী পাবে এক-চতুর্থাংশ যদি স্বামীর সন্তান না থাকে, আর সন্তান থাকলে পাবে এক-অষ্টমাংশ। এই আয়াতে বৈপিত্রেয় ভাই-বোনের অংশও বর্ণিত হয়েছে, যেখানে প্রত্যেকে ছয় ভাগের এক ভাগ পাবে, আর অধিক হলে তারা এক-তৃতীয়াংশে শরিক হবে।
পরিশেষে, সুরা নিসার ১৭৬ নম্বর আয়াতে 'কালালা' বা এমন ব্যক্তির উত্তরাধিকার সম্পর্কে বলা হয়েছে যার বাবা-মা ও সন্তান নেই। সেখানে বলা হয়েছে, এমন ব্যক্তি মারা গেলে তার বোন থাকলে সে পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধেক পাবে। আর মৃত নারী সন্তানহীনা হলে তার ভাই উত্তরাধিকারী হবে। দুই বোন থাকলে তারা দুই-তৃতীয়াংশ পাবে। আর ভাই ও বোন উভয়ই থাকলে পুরুষ পাবে দুজন নারীর সমান। আল্লাহ এই বিধানগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যাতে মানুষ বিভ্রান্তিতে পতিত না হয়।





