নবীজি (সা.) ও সাহাবিদের অনেকের পেশা ছিল ব্যবসা, যা আমাদের জন্য আদর্শ। ন্যায়-নীতি ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা ইহকাল ও পরকালে সুফল বয়ে আনে, অথচ অসৎ পন্থায় ব্যবসা করলে উভয় জগতেই ব্যর্থতা ও কুফল নেমে আসে। ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসায়ীদের জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা।
ব্যবসায় সততা বজায় রাখা অপরিহার্য। গ্রাহক যখন বিক্রেতাকে সৎ হিসেবে চেনে, তখন সে আবারও সেই দোকানে ফিরে আসে, যা ব্যবসার উন্নতির কারণ হয়। বিপরীতে বিক্রেতা অসৎ হলে ক্রেতারা তার ধারে ঘেঁষে না, যা ব্যবসায়ীর জন্য ক্ষতির কারণ। ভালো পণ্যের সঙ্গে মন্দ মিশ্রিত করা বা ধোঁকা দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, রাসুল (সা.) একবার এক খাদ্য বিক্রেতার খাদ্যের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ভেজা বা নিম্নমানের খাদ্য দেখতে পান। তিনি এর কারণ জানতে চাইলে বিক্রেতা বৃষ্টির কথা বললে রাসুল (সা.) তাকে সতর্ক করে বলেন, যে ধোঁকা দেয় সে আমার উম্মত নয় (মুসলিম: ১০২)।
একজন মুমিনের অন্যতম গুণ হলো সত্য বলা। ব্যবসায় মিথ্যা বলা কবিরা গুনাহ। রাসুল (সা.)-কে এক প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছিল যে, একজন মুমিন ভীরু বা কৃপণ হতে পারে, কিন্তু সে মিথ্যুক হতে পারে না (সুনানে বাইহাকি: ৪৮১২)। মিথ্যা পরিহার করার নির্দেশ দিয়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, মিথ্যা পাপাচারের দিকে এবং পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায় (মুসলিম: ২৬০৭)।
ক্রেতার কাছে সঠিক ওজন নিশ্চিত করা বিক্রেতার কর্তব্য। কোরআনুল কারিমে পরিমাপে সঠিক হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং যারা ওজনে কম দেয় তাদের জন্য ধ্বংসের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে (সুরা মুতাফফিফিন: ১-৩)। আল্লাহতায়ালা বলেন, মেপে দেয়ার সময় পূর্ণ মেপে দেবে এবং সঠিক পাল্লায় ওজন করবে। এটি উত্তম, এর পরিণাম শুভ (সুরা বনি ইসরাইল: ৩৫)। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্য কারও ক্ষতিসাধন করে, আল্লাহতায়ালা তা দিয়েই তার ক্ষতিসাধন করেন (তিরমিজি: ১৯৪০)।
ব্যবসায় কোমল আচরণ করা জরুরি। যারা কোমল আচরণ করে এবং ক্রেতার প্রতি সদয় থাকে, তাদের জন্য রাসুল (সা.) দোয়া করেছেন (বোখারি: ২০৭৬)। অনেকে পণ্য বিক্রির সময় মিথ্যা কসম করে, যা অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসুল (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তিন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলবেন না, যাদের একজন হলো ব্যবসায়িক পণ্য মিথ্যা কসম খেয়ে বিক্রয়কারী (মুসলিম: ১০৬)।
সুদভিত্তিক ব্যবসা সম্পূর্ণ হারাম। ব্যবসার নামে সুদের কারবার করলে পরিণামে স্বল্পতা দেখা দেয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, সুদ যদিও বৃদ্ধি পায়, কিন্তু এর শেষ পরিণতি হচ্ছে স্বল্পতা (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৭৯)। আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন (সুরা বাকারা: ২৭৫)। ক্রেতাকে বাধ্য করে কোনো পণ্য কেনানো ইসলামে অনুমোদিত নয়। বিক্রেতার জন্য এটি হারাম, কারণ সন্তুষ্টি ছাড়া কারো সম্পদ গ্রহণ বৈধ নয় (সুরা নিসা: ২৯)।
প্রতারণামূলক দালালি বা পণ্য কেনার ভান করে দাম বাড়িয়ে দেওয়াও নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ক্রেতার ভান করে তোমরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিও না (মিশকাতুল মাসাবিহ: ৫০২৮)। এছাড়া কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য খাদ্য মজুত করাও হারাম। রাসুল (সা.) বলেন, পাপী ব্যক্তিই মজুতদারি করে (মুসলিম: ১৬০৫)। এমন মজুতকারীর জন্য রাসুল (সা.) দুরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্যের শাস্তির কথা বলেছেন (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৩৮)। পরিশেষে, অধিক লাভের আশায় ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বিক্রি করা থেকে বিরত থাকতে হবে, কারণ পূর্ণ মুমিন হতে হলে নিজের জন্য যা পছন্দ করা হয়, ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করতে হয় (সুনানে নাসায়ি: ৫০১৭)।





