দীর্ঘ দেড় মাসের বেশি সময় পর দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে। শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর গত সোমবার রাত থেকেই এই সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, যা মঙ্গলবার আরও কিছুটা বেড়েছে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাড়তি গ্যাসের সিংহভাগই শিল্প গ্রাহকদের দেওয়া হচ্ছে। এলএনজি সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মহেশখালীতে ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিদুর্ঘটনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এলএনজি কার্গো সময়মতো না আসায় সরবরাহ ব্যাহত হয়েছিল। এখন কার্গো নিয়মিত আসছে।
পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্র অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মোট ১০টি এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা থাকলেও দরপত্র ও উচ্চমূল্যের কারণে ৯টি কার্গো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গানভরের দুটি, স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে আরামকোর দুটি এবং খোলাবাজার থেকে কেনা হয়েছে পাঁচটি কার্গো। আরপিজিসিএল জানিয়েছে, আরামকোর দুটি, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম ও পস্কোর একটি করে কার্গো ইতিমধ্যে সরবরাহ করেছে। এরপর ১৬ সেপ্টেম্বর গানভর, ১৮ সেপ্টেম্বর আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এনার্জি, ২৫ সেপ্টেম্বর আরামকো ও ২৮ সেপ্টেম্বর গানভরের একটি করে কার্গো আসার কথা। এছাড়া অক্টোবরের জন্য ১১টি এলএনজি কার্গো কেনার প্রক্রিয়া চলছে, যার মধ্যে ৮টি নিশ্চিত হয়েছে এবং আরও ৩টি কিনতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। গত সোমবার রাত ১০টায় এলএনজি সরবরাহ করা হয় ৯৮ কোটি ঘনফুট, যা মঙ্গলবার রাত আটটায় বেড়ে ১০১ কোটি ঘনফুট হয়েছে। এতে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২৬৩ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে ১৬২ কোটি ঘনফুট এসেছে দেশি গ্যাসক্ষেত্র থেকে। গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের আগে দিনে ২৬৪ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হতো, যার মধ্যে এলএনজি থেকে আসত ৯৯ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে দেশি গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ৪ কোটি ঘনফুট কমেছে।
গ্যাসের চাপ বাড়লেও শিল্প মালিকরা বলছেন, এখনো প্রত্যাশিত চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। ফকির নিটওয়্যার লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ ইমতিয়াজ রাজীব জানিয়েছেন, চাপ ১০ পিএসআই থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে ৪ পিএসআই পাওয়া যাচ্ছে, যা আগের চেয়ে কিছুটা বেশি। তবে নারায়ণগঞ্জ ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেনের মতে, কারখানা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় চাপ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
গ্যাস সরবরাহের উন্নতির সাথে সাথে দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণও কিছুটা কমেছে। গত মাসে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হলেও সোমবার দিবাগত রাত একটায় আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়েছে। মঙ্গলবার দিনের বেলায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট রোববার দুপুর ১২টা থেকে চালু হয়েছে, যা থেকে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি সরবরাহ করা হচ্ছে। এর আগে বুধবার রাতে কারিগরি ত্রুটিতে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ হয়েছিল। এছাড়া বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রোববার বেলা সাড়ে ১১টায় কারিগরি কারণে বন্ধ হয়ে যায়, যা গতকাল ৬১০ মেগাওয়াট উৎপাদন করেছে এবং পুরোপুরি ফিরতে আরও দুই দিন লাগতে পারে। পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ থাকায় ৫৭০ মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে, তবে অন্য কেন্দ্রটিতে কয়লা সরবরাহ বাড়ায় ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন হয়েছে। ফার্নেস তেলের পর্যাপ্ত মজুত না থাকায় তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না, তবে ২০ সেপ্টেম্বরের পর তা বাড়তে পারে।
প্রতিটি কেন্দ্র ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতায় নির্মিত হয়।





