১ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পরিবেশ রক্ষা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখা ইসলামের অনন্য ইবাদত

প্রকাশ:

পরিবেশ বলতে আমাদের চারপাশের অবস্থা, যেমন—গাছপালা, বাড়ি-ঘর, মাটি, পানি, বায়ু, জীবজন্তু, পশুপাখি, রাস্তাঘাট, নদীনালা, আকাশ-বাতাস, পাহাড়-পর্বত, যানবাহন ও কলকারখানাকে বোঝায়। এ সবকিছুই মহান আল্লাহর অপূর্ব নেয়ামত। কোরআনের বিভিন্ন স্থানে বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে, যেন মানুষ এসবের সৌন্দর্য দেখে পুলকিত হয় এবং সবকিছুর উন্নতি ও সক্রিয়তা দেখে আল্লাহর শক্তিমত্তার কথা স্মরণ করে। আল্লাহতায়ালা বনভূমির মাধ্যমে পৃথিবীকে সুশোভিত করেছেন এবং গাছপালার মাধ্যমে পরিবেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার শিক্ষা দিয়েছেন। সুরা নাহলের ১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তিনি পানি দ্বারা শস্য, জাইতুন, খেজুর গাছ, আঙুর ও সবধরনের ফল জন্মান, যা চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন।

পরিবেশ বান্দার প্রতি আল্লাহর বড় অনুগ্রহ। পরিবেশ বিনষ্ট হলে মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদ ধ্বংস হবে। তাই মানুষের দায়িত্ব হলো সে যে পরিবেশে বাস করে তা সংরক্ষণ করা এবং বিপন্ন না করা। ইসলাম পরিবেশ রক্ষার উপকরণসমূহ গ্রহণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যার মধ্যে বৃক্ষরোপণ এবং পানির অপচয় না করা উল্লেখযোগ্য। রাসুল (সা.) বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও কারো হাতে একটি চারা থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে (মুসনাদে আহমদ: ১২৯০২)। মানুষ মূলত সামাজিক জীব এবং তাকে ঘিরেই পরিবেশ ও সমাজের সৃষ্টি। সুরা ইয়াসিনের ৩৩ নম্বর আয়াতে মৃতভূমিকে সঞ্জীবিত করার মাধ্যমে মানুষের আহার ও জীবন ধারণের নিদর্শনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মানবজীবনে প্রাকৃতিক পরিবেশের গুরুত্ব অপরিসীম এবং পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ঈমানের অঙ্গ। উন্মুক্ত স্থানে ময়লা-আবর্জনা, থুথু, কফ ফেলা বা মলমূত্র ত্যাগ করা পরিবেশ দূষণ করে, যা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। নোংরা ও দূষিত পরিবেশ রোগ-ব্যাধির প্রধান কারণ। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা তোমাদের আঙিনাকে পরিচ্ছন্ন রাখো (তিরমিজি: ২৭৯৯) এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ (মুসলিম: ২২৩)। এছাড়া, ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে আল্লাহ পাহাড়-পর্বতকে পেরেকের মতো গেড়ে দিয়েছেন, যেন পৃথিবী আন্দোলিত না হয় (সুরা নাহল: ১৫)।

বৃক্ষরোপণ পরিবেশ সংরক্ষণের অন্যতম উপায়। কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষ রোপণ করে বা শস্য উৎপাদন করে এবং তা থেকে মানুষ, পাখি বা পশু আহার গ্রহণ করে, তবে তা উৎপাদনকারীর জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে (বোখারি: ২৩২০, মুসলিম: ১৫৬৩)। এছাড়া বৃক্ষের পরিচর্যা ও সংরক্ষণে ধৈর্য ধারণ করলে প্রতি ফলের বিনিময়ে সদকার নেকি পাওয়া যায় (মুসনাদে আহমদ: ১৬৭০২)। যে ব্যক্তি বৃক্ষ রোপণ করে, আল্লাহ তাকে ওই বৃক্ষের ফলের সমপরিমাণ প্রতিদান দেবেন (মুসনাদে আহমদ: ২৩৫৬৭)। গাছপালা মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য শ্রেষ্ঠ নেয়ামত, যা সুরা সাজদার ২৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে।

পানি ছাড়া জীবন অচল, তাই একে জীবনের অপর নাম বলা হয়। কোরআনের ৬০ স্থানে পানির গুরুত্ব আলোচনা করা হয়েছে এবং আল্লাহ বলেছেন, প্রাণবান সবকিছু পানি হতে সৃষ্টি করেছি (সুরা আম্বিয়া: ৩০)। ইসলাম ইবাদতের ক্ষেত্রেও পানি অপচয় করতে নিষেধ করেছে এবং পানির উৎস, রাস্তার মাঝে ও বৃক্ষের ছায়াতলে মলত্যাগ করতে বারণ করেছে। পানির স্বল্পতা কৃষি হ্রাস করে এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধের কারণও হতে পারে। আধুনিক শিল্পবিপ্লবের ফলে পরিবেশ দূষণ ও খাদ্য-বায়ু দূষণ মানবদেহের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধবিগ্রহ, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। সুরা রুমের ৪১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। পরিশেষে, পরিবেশ সংরক্ষণের মাঝেই মানব জীবনের সুরক্ষা নিহিত।

শেয়ার করুন