২ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষায় বাড়ছে বৈষম্য ও ব্যয়, কোচিং-প্রাইভেটের ওপর নির্ভরতা চরমে

প্রকাশ:

জাতীয় শিক্ষানীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ পঞ্চম শ্রেণি থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করা। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও এই লক্ষ্য এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা করার পক্ষে যুক্তি ছিল যে, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে শিক্ষার্থীরা মৌলিক শিক্ষা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারে না। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত হলে শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন করার পাশাপাশি পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পথও প্রশস্ত হতো। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ থাকলেও শিক্ষার মান ও শিক্ষকসংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের কোচিং ও প্রাইভেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা অবৈতনিক শিক্ষার মূল ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে দেশে প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এরপর নানা সরকারের সময় আটটি শিক্ষা কমিশন বা কমিটি গঠিত হয়েছে। এখন বিএনপি সরকার নতুন শিক্ষানীতি করবে নাকি অন্য কিছু করবে, তা স্পষ্ট নয়। যদিও এরই মধ্যে ২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রমে ব্যাপক মাত্রায় পরিমার্জনের ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়েও বেশ কিছু পরিমার্জনের পাশাপাশি চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি বই যুক্ত করা হবে।

এ পরিস্থিতিতে আজ ১৭ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে মহান শিক্ষা দিবস। ১৯৬২ সালের এই দিনে তৎকালীন শরিফ শিক্ষা কমিশনের প্রতিবাদ থেকে যে শিক্ষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল সবার জন্য গণমুখী ও বৈষম্যহীন শিক্ষা। ৬৪ বছর পরও সেই লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি; বরং শিক্ষায় বৈষম্যের নানা ধরন যুক্ত হয়েছে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ওই শিক্ষানীতির প্রতিবাদে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রাণ হারান কয়েকজন ছাত্র। এর পর থেকে দিনটিকে শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে শিক্ষক ও ছাত্রসংগঠনগুলো।

প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—প্রতিটি স্তরেই আয়, অবস্থান ও সুযোগের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিট গত জুনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের দুই হাজারের বেশি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে। দেখা যায়, অনেক শিশু বাংলা বর্ণ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না। ইংরেজি ও গণিতেও রয়েছে দুর্বলতা। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের অধিকাংশ শিশুর শিক্ষার প্রধান ভরসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ে টিউশন ফি নেই। কিন্তু শিক্ষকসংকট, শিক্ষার মান ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

বর্তমানে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ১৬ শতাংশের বেশি, যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:২৮। তবে এর আড়ালে রয়েছে বড় বৈষম্য। শহরের তুলনায় চর, হাওর, পাহাড় ও দুর্গম এলাকার অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট বেশি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টি এখনো শূন্য। অবশ্য এসব পদে পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, এ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে কাজ করতে হবে। আলোচনা শুরু হয়েছে এবং আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে অগ্রগতি জানানো যাবে। নিয়োগবিধি অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের পদের ৮০ শতাংশ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ হয়। ফলে একসঙ্গে অনেক সহকারী শিক্ষকের পদোন্নতি হলে নতুন সংকট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। ঢাকার হাজারীবাগ এলাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, শিক্ষার মান উন্নত করতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও তাঁদের পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রাথমিকের পর মাধ্যমিকে এসে বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়। এ স্তরের ৭৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে মাত্র ৬ শতাংশ। অর্থাৎ অধিকাংশ শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে শিক্ষক, অবকাঠামো ও শিক্ষার মানে রয়েছে ব্যাপক তারতম্য। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সূত্রমতে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত ১৫ হাজার ২৯৩টি পদের মধ্যে ৩ হাজারের বেশি শূন্য। প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদ খালি। সবচেয়ে বেশি সংকট বিজ্ঞান, গণিত ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে। শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষকসংকট ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব মাধ্যমিক শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা।

এখন মাধ্যমিকে বিদ্যালয়ের পাঠদানই যথেষ্ট নয়। পরীক্ষায় ভালো ফল করতে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে কোচিং বা গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পুরান ঢাকার এক শিক্ষার্থীর পরিবারের মাসে দুটি গৃহশিক্ষকের পেছনে খরচ হয় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টাকা। সচ্ছল পরিবার যেখানে এই ব্যয় বহন করতে পারে, নিম্ন আয়ের পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি বাদে ওপরের সব শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। লটারি পদ্ধতি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিক্ষাবিদদের আশঙ্কা, এতে শিশুদের ওপর চাপ বাড়বে এবং ভর্তি-কোচিংয়ের প্রবণতা নতুন করে বাড়তে পারে।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দৃশ্যমান। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশে ১৭৮টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে বছরে ব্যয় ২ লাখ ৫২ হাজার ২৪১ টাকা, অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় মাত্র ৭৮৯ টাকা। দেশের উচ্চশিক্ষার ৭০ দশমিক ২০ শতাংশ শিক্ষার্থীই পড়ছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোয়। অধিকাংশ কলেজেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও গবেষণার পরিবেশ সীমিত। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি অর্থসহায়তা পায় না। পরিচালন ব্যয় মেটাতে তাদের প্রায় পুরোপুরি টিউশন ফির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে উচ্চশিক্ষার ব্যয় সাধারণ পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যায়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্য প্রকট। শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়ে সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষকসংকট, অবকাঠামো ও শিক্ষার মানে বিস্তর পার্থক্য তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্য মানে জাতির ভিত্তি দুর্বল করা। এদিকে আবার প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা চালু হয়েছে। শিক্ষাবিদদের বড় অংশের মতে, এতে শিক্ষার সমতা প্রতিষ্ঠার বদলে প্রতিযোগিতা ও বৈষম্য বাড়তে পারে। তাঁদের যুক্তি, বৃত্তির জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীর ওপর বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়। এতে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে পড়তে পারে। একই প্রশ্ন রয়েছে অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা নিয়েও। নতুন সরকার আগামী অর্থবছরে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে, যা জিডিপির ২ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, প্রয়োজনের ভিত্তিতে এবং বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য সামনে রেখে অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

শেয়ার করুন