চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ১০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে এক চিকিৎসককে গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল সোমবার রাতে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়। ভুক্তভোগী চিকিৎসকের নাম এম ওয়াই এফ পারভেজ। তিনি হাটহাজারীর চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের আমান বাজারের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়মিত রোগী দেখেন। বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ এবং তাঁর সহযোগী মো. রায়হানের নাম ব্যবহার করে এই হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ ও সাধারণ ডায়েরি (জিডি) সূত্রে জানা গেছে, হুমকির ঘটনায় গত ৩ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী থানায় একটি জিডি করেন ডা. পারভেজ। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, গত ২ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা ৫৪ মিনিটের দিকে তাঁর চেম্বারের সিরিয়াল নেওয়ার মোবাইল নম্বরে একটি বিদেশি নম্বর থেকে কল আসে। তাঁর সহকারী হ্যাপি বড়ুয়া কলটি রিসিভ করার পর অপর প্রান্তের ব্যক্তি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে চান। পরে ফোনটি ডা. পারভেজকে দেওয়া হলে ওই ব্যক্তি নিজেকে বড় সাজ্জাদ পরিচয় দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০ লাখ টাকা প্রস্তুত রাখতে বলেন। টাকা না দিলে যেকোনো সময় চেম্বারে এসে তাঁকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।
এরপরও বিভিন্ন সময়ে বড় সাজ্জাদের সহযোগী মো. রায়হানের পরিচয় দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে অডিও ও লিখিত বার্তা পাঠিয়ে ডা. পারভেজকে হুমকি দেওয়া হয়। বার্তায় বলা হয়, ‘টাকা না পাঠালে অনেক বড় বিপদ হয়ে যাবে। তোমার পেছনে আমাদের লোক লাগানো আছে। তোমার গাড়ির নম্বরও আছে। ১০০ জন পুলিশ থাকলেও তোমাকে গুলি করে মেরে ফেলব। রোগী সেজে তোমাকে মেরে ফেলা হবে, চেম্বারে গিয়ে।’ নির্ধারিত সময়ে চাঁদা না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে পরবর্তীতে চাঁদার পরিমাণ দ্বিগুণ করে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘আমি রায়হান কে, তুমি চিনো না। বেয়াদবি করতেছ। ১০ লাখ টাকার বদলে ২০ লাখ টাকা দিতে হবে।’
হুমকি ও চাঁদা দাবির অভিযোগে সোমবার রাতে পুলিশ চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—কামরুল হাসান ওরফে সাগর (২৫), মো. রিকু (২৫), মো. তরিকুল ইসলাম ওরফে রোহিত (২০), আহমদুল্লাহ ওরফে মাসুম মেম্বর (৪০), আহমদ রেজা শাকিল (২৫), মো. মানিক (৪০) ও নুরুল আলম। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া সবাই বর্তমানে কারাগারে থাকা সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনের সহযোগী। ডেভিড ইমন আবার সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে পরিচিত। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে বেশ কিছু দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, এই চক্রটি বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর কাছে সন্ত্রাসী রায়হান, বড় সাজ্জাদসহ অন্যান্যদের পরিচয় দিয়ে চাঁদা দাবি করে আসছিল এবং ভয়ভীতি দেখাচ্ছিল। তাঁরা ডা. পারভেজকেও একইভাবে হুমকি দিয়েছিলেন। তাঁদের কাছ থেকে বেশ কিছু দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ জানান, গত ২৯ জুলাই যশোর দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি কারাগারে থাকলেও তাঁর সহযোগীরা বাইরে থেকে মানুষের কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা সাধারণত বড় সাজ্জাদ বা রায়হানের নির্দেশে চাঁদা চায়, তবে অনেক সময় তাঁদের অগোচরে তাঁদের নাম ব্যবহার করেও চাঁদা দাবি করত।
জানতে চাইলে ভুক্তভোগী চিকিৎসক এম ওয়াই এফ পারভেজ বলেন, প্রতিদিন তাঁকে অনেক রোগী দেখতে হয় এবং চিকিৎসার প্রয়োজনে বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করতে হয়। সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ও তাঁর সহযোগীদের হুমকির পর থেকে তিনি প্রচণ্ড আতঙ্কে ছিলেন। পুলিশ চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করায় কিছুটা স্বস্তি পেলেও তিনি দাবি করেন, এই চক্রের মূল নির্দেশদাতাকে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং যারা ধরা পড়েছে, তারা যেন সহজে কারাগার থেকে জামিনে বের হতে না পারে।





