দেশের পথশিশুদের ৫৮.২ শতাংশের নেই জন্মসনদ, বঞ্চিত মৌলিক অধিকার থেকে

প্রকাশ:

জন্মসনদ একটি ছোট কাগজের টুকরো মনে হলেও, বস্তি ও পথশিশুদের জীবনে এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কাগজের অভাবে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাসের ২০২৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, পথে বেড়ে ওঠা শিশুদের ৫৮ দশমিক ২ শতাংশের কোনো জন্মসনদ নেই। একই জরিপে আরও দেখা গেছে, বস্তি এলাকার ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ পরিবার সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতার বাইরে রয়েছে।

ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী শহরের ৬৬৭ জন পথশিশু এবং বস্তি এলাকার ১ হাজার ২৪৬টি পরিবারের ওপর এই জরিপটি চালানো হয়। এতে অংশ নেওয়া পথশিশুদের ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ বর্তমানে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। রাজধানীর মিরপুর সেকশন-৭ এর ঝিলপাড় বস্তিতে বসবাসকারী ১৮ বছর বয়সী বিলকিস বানু এবং ১৬ বছর বয়সী আছিয়ার মতো অনেকেই বাল্যবিবাহের শিকার। তাদের মতে, জন্মসনদ না থাকায় ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করার বাধ্যবাধকতা অনেকের ক্ষেত্রেই কার্যকর হচ্ছে না। মিরপুরের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় চারটি বস্তিতে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বাস করে, যার মধ্যে ৮ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যাই ৮ হাজারের বেশি এবং তাদের একটি বড় অংশের জন্মনিবন্ধন নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন করাতে গেলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়, যা দরিদ্র পরিবারের জন্য বহন করা অসম্ভব।

জন্মনিবন্ধন না থাকা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতায় অনেক শিশু স্কুলে ভর্তি হতে পারছে না। এর ফলে তারা মোবাইল আসক্তি, শিশুশ্রম এবং বাল্যবিবাহের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. যাহিদ হোসেন জানান, ঢাকায় স্থায়ী বাসিন্দার তুলনায় ভাসমান মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এখানে নিবন্ধনের হার কম। তবে নিয়মানুযায়ী জন্মস্থান বা বর্তমান ঠিকানা থাকলে নিবন্ধন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনূর্ধ্ব-৫ বছর বয়সী শিশুদের জাতীয়ভাবে জন্মনিবন্ধনের হার বর্তমানে ৫৯ শতাংশ, যা ২০১৯ সালে ছিল ৫৬ শতাংশ। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।

কারিতাস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের পরিচালক থিওফিল নকরেক একে কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়, বরং একটি মানবাধিকার সংকট হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, জন্মসনদহীন শিশুদের ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ তাদের বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর জানে না, যা নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে। পরিস্থিতি উত্তরণে কারিতাস বাড়ি বাড়ি ক্যাম্পেইন, হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকে জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থা এবং পথশিশুদের জন্য বিশেষ ভাতা চালুর সুপারিশ করেছে। দাউদ জীবন দাশ বলেন, সরকারের নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় থাকা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অনেকে যে ভাতা পাচ্ছেন, তা অত্যন্ত নগণ্য। মাসিক ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা কখনোই বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী সহায়তা হতে পারে না। এছাড়া, বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি এবং আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করার দাবিও জানানো হয়েছে।

শেয়ার করুন