ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: বিশ্বব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

প্রকাশ:

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ দ্রুত বদলে দিচ্ছে। মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা এই যুদ্ধে নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নিরাপত্তার জন্য বিকল্প চিন্তায় বাধ্য করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরের আলো ফোটার আগেই মার্কিন-ইসরাইল যৌথ বাহিনী কোনো উসকানি ছাড়াই ইরানে বড় ধরনের হামলা চালায়। হামলার প্রথম প্রহরেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলী খামেনিসহ প্রায় ডজনখানেক শীর্ষ সামরিক-বেসামরিক নেতা নিহত হন। একই হামলায় একটি গার্লস নার্সারি স্কুলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে প্রায় ১৫০ জন কন্যাশিশু প্রাণ হারায়। ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান-আমেরিকার মধ্যে আলোচনা চলাকালেই এই কাপুরুষোচিত হামলাটি চালানো হয়।

এই হামলার পর ইরান দ্রুত পরিস্থিতি সামলে পাল্টা হামলা চালায় মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন সামরিক স্থাপনাসমূহে এবং ইসরাইলের অভ্যন্তরে। টানা ৪০ দিনের যুদ্ধের পর আমেরিকা ইরানের শক্তিমত্তার গভীরতা টের পায় এবং ট্রাম্প পাকিস্তানের সহযোগিতায় যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে ৬০ দিনের আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হলেও ৭ জুলাই আমেরিকা পুনরায় ইরানে আক্রমণ চালালে ইরান আলোচনা বর্জন করে আরও শক্তিশালী পাল্টা আক্রমণ করে। এই দফায় ১৩ দিনের যুদ্ধের পর আমেরিকার মারাত্মক অস্ত্র ঘাটতির জন্য আবার হামলা বন্ধ করে যুদ্ধবিরতি দিতে বাধ্য হয়। মার্কিন সামরিক শক্তির ‘মিথ’ ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ায় আমেরিকা এখন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে। শুরুতে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য থাকলেও বর্তমানে তাদের উদ্দেশ্য হরমুজ প্রণালী মুক্ত করা এবং তেলের দর নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

এই যুদ্ধের অন্যতম বড় বাই-প্রোডাক্ট হলো সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নেতৃত্বে ‘মক্কা চুক্তি’র মাধ্যমে নতুন মুসলিম প্রতিরক্ষা জোটের উত্থান। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে এই সামরিক জোটের ঘোষণা আসে। জোটের মূলমন্ত্র হলো, এই তিনটি দেশের যেকোনো একটিতে বহিঃশক্তির আক্রমণ তিনটি দেশের ওপরই আক্রমণ বলে বিবেচিত হবে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই জোট বিশ্বব্যবস্থায় একক মার্কিন আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। ভারত এই জোটের কারণে শঙ্কিত হয়ে ইসরাইলের সাথে বন্ধুত্ব আরও ঘনিষ্ঠ করছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে এবং আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি যুদ্ধের স্থবিরতা কাটাতে চাইছেন। ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা উপলব্ধি করে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের কষ্টের প্রহরটা দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী করার ফাঁদে ফেলে সামরিক ফ্যাসিলিটিগুলোতে কমান্ডো স্টাইলে হামলা চালিয়ে মার্কিন জনবল ও অস্ত্র-গোলাবারুদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে। ইরাক থেকে মার্কিন সেনা আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও মার্কিন ঘাঁটির যৌক্তিকতা নিয়ে পুনর্বিবেচনা শুরু হয়েছে। শান্তি নির্ভর করবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অস্থির মনস্তত্ত্ব এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে কতটুকু প্রভাবিত করে তার ওপর।

শেয়ার করুন