উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ নির্ধারিত সময়ের আগেই শুক্রবার সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। মহড়াটির অর্ধেক কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরই তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এবারের এই আয়োজনে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১৮ হাজার সেনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও আরও ১১টি মিত্র দেশের সামরিক সদস্যরা অংশ নিয়েছিলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে মহড়াটিকে ‘উত্তর কোরিয়ার প্রতি অনুপযুক্ত ও বৈরী’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি পেন্টাগনকে এর পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই সিদ্ধান্ত তার মিত্র দেশগুলোকে বিস্মিত করেছে। যদিও দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন এটিকে পারস্পরিক সমঝোতার ফল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে মহড়ার পরিসর কমানোর বিষয়ে সিউলের কর্মকর্তারা আগে থেকে অবগত ছিলেন না। এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়াও জাপান ও তাইওয়ানের মতো দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যারা দীর্ঘকাল ধরে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ গবেষক জো বি-ইউনের মতে, ট্রাম্পের এই একতরফা সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার মনে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আস্থার সংকট সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ২৭ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যার সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও কমানোর আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এমনকি উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। যদিও দুই কোরিয়া এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে এবং কোনো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি, তবুও ২০২৪ সালে কিম জং উন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণের দীর্ঘদিনের নীতি পরিত্যাগ করেছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য বর্তমানে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্যোগেই ট্রাম্প ও কিম জং উনের মধ্যে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাম্প প্রশাসন সিউলের প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিন সেনাদের জন্য বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করে যা যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সেজং ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট চেওং সিয়ং-চাংয়ের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের দিকে নজর দেওয়া উচিত। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন এবং একে শান্তি প্রতিষ্ঠার সাহসী পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। তবে বৈঠকের পরই ট্রাম্প হঠাৎ করে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২০১৯ সালে দ্বিতীয় বৈঠকে কিম উত্তর কোরিয়ার পুরো পারমাণবিক স্থাপনা পরিত্যাগ করতে রাজি না হওয়ায় কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়।
ট্রাম্প দাবি করে আসছেন যে কিম জং উনের সঙ্গে তার দারুণ সম্পর্ক রয়েছে এবং বছরের শেষ দিকে তিনি কিমের সঙ্গে আবারও বৈঠক করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তবে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম ইয়ো জং ট্রাম্পের এই দাবিকে গুরুত্ব দেননি এবং স্পষ্ট করেছেন যে উত্তর কোরিয়া কখনোই তাদের পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করবে না। এছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষ নিয়ে উত্তর কোরিয়ার বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সেনা সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে।





