বাংলাদেশে গত কয়েকদিন ধরে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তীব্র গরমে সারা দেশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে, আর ঢাকার বাইরে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎহীন থাকার সময়সীমা ১০ ঘণ্টা ছাড়িয়ে গেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং দেশের সব বিতরণ কোম্পানি বর্তমানে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। পিডিবির কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিদ্যুতের এমন সংকট আগে খুব একটা দেখা যায়নি।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, রোববার বিকাল ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। বিকাল ৫টায় সরবরাহ কিছুটা বেড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছালেও লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট। একই সময়ে সারা দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট, যা গত সপ্তাহের সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই ঘাটতির পেছনে প্রধানত গ্যাস ও কয়লা সংকটকে দায়ী করছে পিডিবি। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি থাকলেও সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে অন্তত ২ হাজার মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া কয়লা সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বড়পুকুরিয়া, বরিশাল ইলেকট্রিক কোম্পানি, মাতারবাড়ী, পায়রা, রামপাল এবং এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৭১০ মেগাওয়াট, এবং এসএস পাওয়ারের দুটি ইউনিট থেকে উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ১৬৩ মেগাওয়াট।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ কমে যাওয়ায়। আদানি গ্রুপ বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ায় সরবরাহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। রোববার বিকাল ৫টায় পিক আওয়ারে যেখানে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে পাওয়া গেছে মাত্র ৮১৫ মেগাওয়াট। আদানি কর্তৃপক্ষ পিডিবিকে জানিয়েছে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা পরিবহন করতে না পারায় মজুত কমে গেছে, যার ফলে উৎপাদন কমাতে হয়েছে। তবে এই তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে, গ্যাস সংকটের আংশিক কারণ হিসেবে ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর ফলে দৈনিক ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গিয়েছিল। মেরামত শেষে ৫ আগস্ট রাতে আংশিক সরবরাহ শুরু হলেও রোববার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দুটি টার্মিনাল থেকে মোট ৭৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে, যা স্বাভাবিক ১১০ কোটি ঘনফুটের চেয়ে অনেক কম। সব মিলিয়ে গ্যাস ও কয়লা সংকটে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ঘাটতিই বর্তমান ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের মূল কারণ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি জানিয়েছে, কয়লা এবং গ্যাস সংকটের কারণে স্বাভাবিক সময়ের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস। তাই লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হচ্ছে। এর আগে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে তিন হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। কিন্তু রোববার বিকাল ৩টায় লোডশেডিং ছিল তিন হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি এবং দেশের সব বিতরণ কোম্পানি। অভিযোগ আছে অনেক এলাকায় সারাদিন রাতে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। পিডিবির কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিদ্যুতের এমন পরিস্থিতি আগে খুব বেশি হয়নি।
বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি। সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে ৭০ কোটি ঘনফুট। তাই গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে কমপক্ষে দুই হাজার মেগাওয়াট। গতকাল বিকাল ৫টায় দেশের সব গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে তিন হাজার ৫৮৯ মেগাওয়াট। অথচ সক্ষমতা আছে ১০ হাজার মেগাওয়াটের। তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকেও উৎপাদন হচ্ছে দুই হাজার মেগাওয়াটের মতো। অথচ উৎপাদনের সক্ষমতা হচ্ছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।





