এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজারো শিক্ষক-কর্মচারী গত তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের পাওনা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। অবসরে যাওয়ার পর চিকিৎসা, সংসার পরিচালনা কিংবা সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটাতে অনেকেই ঋণের বোঝা কাঁধে নিতে বাধ্য হয়েছেন। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে সরকার ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ দিয়েছে।
আগামী ১৫ আগস্ট দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে অবসর সুবিধা বোর্ড ও শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হবে। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১৩ আগস্ট শিক্ষামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই উদ্যোগের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরবেন।
এই কর্মসূচির আওতায় অবসর সুবিধা বোর্ডের ৭০ হাজার এবং কল্যাণ ট্রাস্টের ৪৪ হাজারসহ মোট ১ লাখ ১৪ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী অর্থ পাবেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল খালেক জানান, শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে সরকার এই মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরাসরি উপকারভোগীদের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হবে, যাতে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের কোনো সুযোগ না থাকে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
অবসর সুবিধা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অবসরে যাওয়া ৭০ হাজার ১১৫টি আবেদন নিষ্পত্তির পরিকল্পনা রয়েছে। বেতনের ৬ শতাংশ চাঁদা জমার ভিত্তিতে একজন শিক্ষক-কর্মচারী সর্বোচ্চ প্রায় ৫ লাখ টাকা পেতে পারেন। বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, ১৩ আগস্টের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে তারা দিন-রাত কাজ করছেন। পুরোনো সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাওয়ায় ডিজিটাল যাচাই কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ আবেদন হাতে-কলমে যাচাই করতে হচ্ছে, যা কাজের চাপ ও সময় বাড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত জমা হওয়া ৪৪ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির কাজ চলছে। এখানে একজন শিক্ষক-কর্মচারী মূল বেতনের ৪ শতাংশ চাঁদা জমার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ প্রায় আড়াই লাখ এবং সর্বনিম্ন প্রায় ৫০ হাজার টাকা পেতে পারেন। কল্যাণ ট্রাস্টের সচিব অধ্যাপক ইউসুফ আলী জানান, ট্রাস্টের মাসিক আয় ৫০ থেকে ৫৫ কোটি টাকা, অথচ প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজার ২০০টি নতুন আবেদন জমা পড়ে। বর্তমানে জমে থাকা আবেদন নিষ্পত্তিতে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের ১ লাখ ১৪ হাজারের বেশি আবেদন পুরোপুরি নিষ্পত্তিতে ১২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। এর মধ্যে অবসর সুবিধা বোর্ডের জন্য ৯ হাজার কোটি এবং কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি দরকার। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারের বর্তমান ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও পুরো সংকট নিরসনে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা জানান, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দেন, যার ফলে শিক্ষকদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। তবে বাকি পাওনা টাকা কবে পাওয়া যাবে, তা নিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে কিছুটা শঙ্কা রয়েই গেছে।





