দেশে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের দ্রুত বিকাশের লক্ষ্যে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের মতো বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর অংশ হিসেবে রপ্তানিমুখী সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আদলে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দক্ষ জনবল তৈরি, গবেষণা ও উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের (বিএইচটিপিএ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুর রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সরকার সেমিকন্ডাক্টরকে একটি কৌশলগত খাত হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং এর সামগ্রিক বিকাশ ও বিনিয়োগ আকর্ষণের দায়িত্ব বিএইচটিপিএকে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন একটি অত্যন্ত মূলধন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, তাই এ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই সরকার একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে।
ফজলুর রহমান আরও জানান, হাই-টেক পার্কগুলোতে বিনিয়োগ আরও আকর্ষণীয় করতে অতিরিক্ত কিছু প্রণোদনার বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। দেশের দক্ষ জনবলের ঘাটতি মেটাতে শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আইটি কেন্দ্রগুলোতে স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিনামূল্যে কর্মপরিসর ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি সেমিকন্ডাক্টর বিশেষজ্ঞদেরও দেশের এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো চিপ ডিজাইন, টেস্টিং, প্যাকেজিং এবং উন্নত চিপ উৎপাদনকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ সেমিকন্ডাক্টর শিল্পভিত্তি গড়ে তোলা। ইতোমধ্যে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (আইসি) ডিজাইন, ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (ইডিএ), আউটসোর্সড সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি অ্যান্ড টেস্টিং (ওস্যাট), প্যাকেজিং ও ফ্রেব্রিকেশনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি, সফটওয়্যার ও কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (মূসক) অব্যাহতি দিয়েছে সরকার।
আইটেস্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআইএ) পরিচালক মুনির আহমেদ এই খাতের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি জানান, শুরুতে চিপ ডিজাইন ও সেমিকন্ডাক্টর টেস্টিংয়ে জোর দিয়ে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে একটি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে ওস্যাট কার্যক্রমেও সম্প্রসারণ সম্ভব। সিউল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত সেমিকন্ডাক্টর বিষয়ক রোডশোতে এসকে হাইনিক্স, ইন্টেল, এএমডি, গ্লোবালফাউন্ড্রিজ, সিনপসিস, স্যান্ডিস্ক, আর্ম এবং ক্রেডোসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে বেশ ইতিবাচক সাড়াও মিলেছে।
মুনির আহমেদ বলেন, বিএসআইএর ‘ব্রেইন গেইন’ উদ্যোগের মাধ্যমে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে এই শিল্পের বিকাশ আরও ত্বরান্বিত হবে। ইতোমধ্যে কোরিয়া অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং পারডু ইউনিভার্সিটির মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান বিএসআইএর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বর্তমানে দেশের একমাত্র সিলিকন টেস্টিং প্রতিষ্ঠান আইটেস্ট বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এ খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বৈশ্বিক ওস্যাট শিল্পের বাজারের আকার প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মুনির আহমেদের মতে, একটি শক্তিশালী সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ভারতের সেমিকন্ডাক্টর মিশনের মতো প্রতিযোগিতামূলক প্রণোদনা চালু করতে পারলে বাংলাদেশে বিশ্বের শীর্ষ সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী এবং প্রতিবছর স্নাতক সম্পন্ন করা আইসিটি ও প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের যথাযথ বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে এই শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল গড়ে তোলা সম্ভব হবে।





