চীনের তৈরি শত শত কাঁধে বহনযোগ্য বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র (ম্যানপ্যাডস) নীরবে ইরানে পৌঁছে যাওয়া ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উচ্চঝুঁকির সংঘাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করছে। কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবিরাম বিমান হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামো যখন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তখন বেইজিং ভারী যুদ্ধট্যাংক বা কূটনৈতিক সম্মেলনের বদলে বহনযোগ্য স্বল্পপাল্লার প্রাণঘাতী বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে হস্তক্ষেপ করেছে। স্বল্প উচ্চতায় উড্ডয়নরত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে সক্ষম এই গোপন সহায়তা পারস্য উপসাগরে পশ্চিমা আকাশ-আধিপত্যের জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ওয়াশিংটনের দ্রুত আকাশ-নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকে দীর্ঘস্থায়ী ও ক্লান্তিকর লড়াইয়ে পরিণত করেছে।
এই অস্ত্র সংগ্রহের বিষয়টি হংকংয়ে নিবন্ধিত মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ঝংছিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, যারা বেইজিংভিত্তিক ঝংছিং বাওশাং গ্রুপের পক্ষে কাজ করেছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পশ্চিম চীনের শিনজিয়াংয়ের উরুমকি থেকে পাকিস্তানের আকাশসীমা এবং মধ্য এশিয়া হয়ে রেলপথের মাধ্যমে ইরানে পৌঁছানো হয়। এরপর সেগুলো ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ইউনিটগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হয়। যদিও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই খবরকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং আঞ্চলিক শান্তি বজায় রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে, তবে এর আড়ালে রয়েছে বেইজিংয়ের সুপরিকল্পিত কৌশলগত অবস্থান। তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানো এড়াতে চাইছে, অন্যদিকে তেহরানকে ভয়াবহ সামরিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে চাচ্ছে।
ইরানের সামরিক নেতৃত্বের জন্য এটি একটি সংকটপূর্ণ সময়, কারণ দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র ও ‘সাপ্রেশন অব এনিমি এয়ার ডিফেন্সেস’ (এসইএড) কৌশল ব্যবহার করে কয়েক মাসের হামলায় তাদের রাডার নেটওয়ার্ক এবং এস-৩০০ ও বাভার-৩৭৩-এর মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে শত শত চলমান ম্যানপ্যাডস রাডার নেটওয়ার্কবিহীন দুর্বল এলাকাগুলোতে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দিচ্ছে, যার ফলে ইরানি বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর চারপাশে বিকেন্দ্রীভূত ও টেকসই নিম্ন-উচ্চতার প্রতিরক্ষাবলয় গড়ে তুলতে পারছে।
প্রযুক্তিগতভাবে কিউডব্লিউ-১২ এবং এফএন-১৬ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক উন্নত এবং আধুনিক পশ্চিমা সামরিক বিমানের জন্য হুমকি। সিএএসআইসি এবং সিএএসির তৈরি এই চতুর্থ প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে ইনফ্রারেড প্রতিরোধব্যবস্থা অতিক্রম করার মতো বিশেষ প্রযুক্তি রয়েছে। কিউডব্লিউ-১২-এ রয়েছে মধ্য-ইনফ্রারেড দ্বৈত-ব্যান্ড ডিজিটাল ফিল্টারিং সিকার এবং এফএন-১৬-এ রয়েছে অতিবেগুনি রোসেট-স্ক্যান কোয়াসি-ইমেজিং সিকার। এগুলো ফ্লেয়ারের প্রলোভন উপেক্ষা করে লক্ষ্যবস্তুর মূল কাঠামোর দিকে আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়া রেডিও ও লেজার প্রক্সিমিটি ফিউজ থাকায় ছোট নজরদারি ড্রোন বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধেও এগুলো কার্যকর।
এই ব্যবস্থাগুলো সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় (প্যাসিভ) পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়, অর্থাৎ কোনো রাডার-তরঙ্গ নির্গত না করায় এগুলো শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। ছোট মোবাইল দলগুলো ভবনের আড়াল বা পাহাড়ি এলাকা থেকে অপটিক্যাল সাইটের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে সেকেন্ডের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে। বেইজিং ভারী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা না পাঠিয়ে কেবল স্বল্পপাল্লার অস্ত্র পাঠিয়েছে, কারণ ভারী ব্যবস্থার জন্য বিশাল নৌ বা বিমান পরিবহনের প্রয়োজন হতো, যা গোপন রাখা অসম্ভব ছিল এবং এতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থাকত।
ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ইরান চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এবং অপরিশোধিত তেলের বড় সরবরাহকারী। ইরানের সামরিক পতন ঘটলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়বে, যা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্য করিডরকে ঝুঁকিতে ফেলবে। একই সঙ্গে এই যুদ্ধক্ষেত্র চীনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জন্য পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করছে, যেখানে কিউডব্লিউ-১২ ও এফএন-১৬-এর কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে। এই সহায়তা তেহরানের ‘মোজাইক এয়ার ডিফেন্স’ স্থাপত্যকে ত্বরান্বিত করছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে পশ্চিমা বিমানশক্তির ওপর সামরিক ও আর্থিক চাপ বজায় রাখতে সক্ষম হবে।





