জেন জি ও আলফার যুগে ফেক ইমেজের আয়ু ফুরিয়ে আসছে

প্রকাশ:

নতুন পৃথিবীতে ক্যামেরা এখন কেবল মিডিয়ার হাতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে গেছে। মানুষের স্মৃতি এখন অ্যালগরিদমে সংরক্ষিত, যেখানে কোনো মুখোশই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। সময়ের বিবর্তনে ইতিহাস নির্মমভাবে কেবল বাস্তব চরিত্রকেই মনে রাখে, কোনো ‘বিশ্বগুরু’ বা ‘অপরিহার্য নেতা’র নির্মিত ভাবমূর্তিকে নয়। জেন জি ও জেন আলফা প্রজন্মের কাছে ফেক ইমেজের কোনো জায়গা নেই বললেই চলে।

একসময় মূলধারার মিডিয়া রাষ্ট্রের পক্ষে বা করপোরেট স্বার্থে জনমত গঠনের একচেটিয়া ক্ষমতা ভোগ করত। বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে মূলধারার গণমাধ্যম সরকারের মুখপত্র হিসেবে কাজ করেছে। শেখ মুজিবকে দেবতুল্য করা বা হাসিনাকে অপরিহার্য হিসেবে তুলে ধরার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পরবর্তী বাস্তবতায় সেই নির্মিত ইমেজ মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। একইভাবে ভারতেও নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে ‘বিশ্বগুরু’ ইমেজ তৈরির চেষ্টা এবং সমালোচনাকে রাষ্ট্রদ্রোহের পর্যায়ে নেওয়ার ঘটনা ‘গোদি মিডিয়া’র বিতর্ক জন্ম দিয়েছে।

রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজমের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ৫৪ শতাংশ মানুষ এখন সামাজিক মাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্ম থেকে খবর সংগ্রহ করেন, যেখানে মূলধারার মিডিয়ার ওপর আস্থা মাত্র ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে। সাংবাদিকতার মূল সম্পদ হলো আস্থা, যা অতিরিক্ত আনুগত্যের কারণে আজ হুমকির মুখে।

জেন জি ও আলফা প্রজন্ম প্রথাগত কর্তৃত্বকে সহজে মেনে নিতে রাজি নয়। তারা তথ্যের উৎস যাচাই করে এবং সম্পাদিত ক্লিপের বিপরীতে আনএডিটেড ফুটেজ খুঁজে বের করে। ডন ট্যাপস্কট, হেনরি জেনকিন্স এবং ক্লে শিরকির মতো তাত্ত্বিকরা দেখিয়েছেন যে, ডিজিটাল যুগে দর্শক কেবল নিষ্ক্রিয় ভোক্তা নয়, বরং তারা নিজেরাও তথ্য নির্মাতা ও যাচাইকারী। অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতির এই যুগে ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রিত বয়ান আর একক সত্য হিসেবে টিকে থাকতে পারছে না।

মনোবিজ্ঞানী জিন টোয়েঞ্জ উল্লেখ করেছেন, জেন জি প্রথাগত নেতৃত্বের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখায় না। তারা স্বচ্ছতা ও সত্যতাকে গুরুত্ব দেয়। ফলে শাসকরা যখন ইতিবাচক ইমেজ তৈরির চেষ্টা করেন কিন্তু বাস্তবে দুর্নীতি ও সহিংসতা চলতে থাকে, তখন নতুন প্রজন্ম সহজেই সেই বৈপরীত্য ধরতে পারে। জেন আলফা প্রজন্ম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শর্ট ভিডিওর মধ্যে বড় হওয়ায় তারা আরও দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম।

অবশ্য সামাজিক মাধ্যম সব সময় সত্যের নিশ্চয়তা দেয় না, সেখানেও ভুয়া খবর থাকতে পারে। তবে এর বড় শক্তি হলো এখানে প্রতিদ্বন্দ্বী বয়ানের সুযোগ রয়েছে, যা মূলধারার মিডিয়ার একচেটিয়া প্রভাব খর্ব করে। বর্তমান সময়ে রাজনীতিবিদদের জন্য বার্তাটি পরিষ্কার—প্রচারণা দিয়ে সাময়িক করতালি পাওয়া গেলেও জেন জির আদালতে টিকে থাকতে হলে বাস্তব আচরণ ও স্বচ্ছতার কোনো বিকল্প নেই।

শেয়ার করুন