উন্নত জীবনের আশায় বিদেশযাত্রায় সর্বস্ব হারাচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবার

প্রকাশ:

দেশে বেকারত্ব, সীমিত কর্মসংস্থান ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে মুক্তির আশায় প্রতিবছর হাজারো তরুণ ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। ছেলের বিদেশযাত্রার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে অনেক পরিবার জমি বিক্রি করছে, দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ভাঙছে, এমনকি চড়া সুদে ঋণও নিচ্ছে। কিন্তু এই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত অনেকের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি ও কনসালট্যান্সি ফার্মের একটি চক্র বিদেশ পাঠানোর নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতারকরা ওয়ার্ক পারমিটের নামে টুরিস্ট ভিসা, জাল ই-ভিসা, ভুয়া চাকরির অফার কিংবা অস্তিত্বহীন নিয়োগপত্র ধরিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে কেউ বিমানবন্দর থেকেই ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কেউ বিদেশের মাটিতে গিয়ে আটকা পড়ছেন। টাকা ফেরত চাইলে উল্টো ভুক্তভোগীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকার বিভিন্ন থানায় দায়ের করা ১৫টি প্রতারণার মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সংঘবদ্ধ চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পরিচিতজন কিংবা দালালের মাধ্যমে আস্থা অর্জন করে। এরপর উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ধাপে ধাপে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। আইনশৃঙ্লা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদেশে যাওয়ার আগে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স, ভিসার সত্যতা এবং চাকরিদাতার তথ্য সরকারি মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। কোনো অবস্থাতেই মৌখিক প্রতিশ্রুতি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয়ের ভিত্তিতে টাকা লেনদেন করা উচিত নয়।

প্রতারণার এমন ভয়াবহ চিত্রের একটি উদাহরণ হলো মোজাম্মেল হকের ঘটনা। তিনি এক বন্ধুর মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সাথে পরিচিত হন। ওই প্রতিনিধি ১৩ জনকে উজবেকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, সার্বিয়া ও ব্রুনাইয়ে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ৩৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। ভুক্তভোগীদের প্রথমে উজবেকিস্তানের ওয়ার্ক পারমিটের বদলে টুরিস্ট ভিসা দেওয়া হয়। পরে তিনজনকে শ্রীলঙ্কায় পাঠিয়ে আটকে রাখা হয় এবং উজবেকিস্তানে যাওয়া অন্যরা কোনো কাজ পাননি। ভুক্তভোগীদের থাকা-খাওয়া ও দেশে ফেরাতে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৮৭ হাজার টাকা গুনতে হয়েছে। এরপর অস্ট্রেলিয়ার কথা বলে আবার টুরিস্ট ভিসা দেওয়া হলে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের ফেরত পাঠায়। শেষে সার্বিয়ার ভিসা দেওয়া হলেও অনলাইনে যাচাই করে সেগুলো জাল বলে প্রমাণিত হয়।

পল্টন থানায় দায়ের করা অপর একটি মামলায় মারহাবা ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেন, জেএস ইন্টারন্যাশনাল কনসালটেন্সির সাথে ১৮ জনকে সার্বিয়া, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর চুক্তি হয়েছিল। জনপ্রতি ৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হিসেবে মোট ১ কোটি ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৮০ টাকা লেনদেন করা হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই বিমানবন্দরে যাওয়ার পর দেখা যায়, তাদের দেওয়া ভিসাগুলো সম্পূর্ণ জাল।

অন্যদিকে, শাসছু মিয়া নামে এক ব্যক্তি সৌদি আরবে চাকরির জন্য নয়াপল্টনের একটি কনসালটেন্সি ফার্মে ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তাকে দেওয়া ভিসাটি যাচাই করে জাল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এসব ঘটনায় দায়ের করা একাধিক মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

শেয়ার করুন