রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি কেবল মেয়াদকালীন প্রশাসনিক সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ

প্রকাশ:

সংবিধানের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা হলেও আইনজ্ঞদের মতে, এটি কোনো ‘অ্যাবসলিউট ইমিউনিটি’ বা চিরস্থায়ী ছাড় নয়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে আইনের শাসন সর্বজনীন এবং রাষ্ট্রপতির অনাক্রম্যতা মূলত তার মেয়াদকালের প্রশাসনিক ও পদমর্যাদাগত সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ। রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি সাধারণ নাগরিকের মর্যাদায় ফিরে আসেন এবং তখন যেকোনো অপরাধের জন্য তার বিচার হতে পারে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম জানান, ৫১ অনুচ্ছেদের সুরক্ষা কেবল রাষ্ট্রপতি পদে থাকা অবস্থায় প্রযোজ্য। তিনি আরো স্পষ্ট করেন যে, রাষ্ট্রপতির সুরক্ষার বিষয়টি সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদের প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত এবং এটি দায়িত্ব পালনের ভেতরের কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। দায়িত্বের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থে দুর্নীতি বা ফৌজদারি অপরাধ করলে তার সুরক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ‘জনতা টাওয়ার’ ও অস্ত্র মামলার উদাহরণ টেনে বলেন, দায়িত্বের বাইরে গিয়ে অপরাধ করলে কাউকে রেহাই দেওয়ার সুযোগ নেই।

আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম স্পষ্ট করেন যে, ৫১ অনুচ্ছেদে দাপ্তরিক সিদ্ধান্তে আইনি সুরক্ষা থাকলেও ফৌজদারি অপরাধের দায়মুক্তি নেই। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, গণহত্যা বা বেআইনি কোনো কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রপতির সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যধারা গ্রহণ করা সম্ভব।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির নয়া দিগন্তকে স্পষ্ট জানান, পদত্যাগের পর সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে যেকোনো অপরাধের বিচার হওয়া একটি ‘সেটেলড ল’ (সুসংপ্রতিষ্ঠিত আইন)। ৫১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কার্যভারকালে মামলা বা ওয়ারেন্ট জারি করা যায় না। কিন্তু তিনি যখন কার্যভারে থাকবেন না, তখন কি হবে? তিনি এরশাদসংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের উচ্চ আদালতের দু’টি ঐতিহাসিক রায়-৪৩ ডিএলআর (আপিল বিভাগ) পৃষ্ঠা ৫০ এবং ৩৭ বিএলডি (হাইকোর্ট বিভাগ) পৃষ্ঠা ৬৬৮ উদ্ধৃত করে বলেন, ‘ওই মামলাগুলোতে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পরিষ্কার বলে দিয়েছেন- রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় অপরাধ ঘটলেও মেয়াদ শেষে মামলা ও বিচার চলতে আইনত কোনো বাধা নেই।’

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির সুরক্ষার দুটি প্রধান দিক রয়েছে। ৫১ (১) অনুচ্ছেদ : রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনকালে নেয়া সিদ্ধান্ত বা কোনো কাজ করা বা না করার জন্য তাকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। ৫১ (২) অনুচ্ছেদ : রাষ্ট্রপতির কার্যকাল চলাকালে তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যাবে না। আইনবিদদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই ধারাগুলো কাউকে অপরাধের চিরস্থায়ী দায়মুক্তি দেয় না। সম্প্রতি সাবেক রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের বিষয়ে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী যেকোনো অভিযোগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব। এছাড়া আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান সরকারও অভিযোগের প্রেক্ষিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন।

শেয়ার করুন