ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার ১২ বছরের দীর্ঘ শাসনকালে প্রথমবারের মতো এমন এক গণবিক্ষোভের মুখে পড়েছেন, যা শেষ পর্যন্ত তাকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অপসারণ করতে বাধ্য করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিরোধিতাহীন শাসনের ভাবমূর্তি বজায় রাখা মোদি সরকারের জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা।
দিল্লিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি-র নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলন মূলত মেডিকেল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দানা বেঁধেছিল। এই অনিয়মের কারণে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হয় এবং এর ফলে হতাশ হয়ে একাধিক শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং পরীক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
সংকট সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি শুরুতে আন্দোলনকারীদের দাবি নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও, শুক্রবার রাতে এক ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে তরুণদের উদ্দেশে কথা বলেন। সেখানে তিনি তাদের ‘গঠনমূলক পরামর্শের’ জন্য ধন্যবাদ জানালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীরা এই বার্তাকে ব্যঙ্গ করে প্রতিবাদ আরও জোরদার করে। পরদিন শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরসহ সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতেও এই আন্দোলনের ব্যাপক প্রভাব দেখা যায়।
সরকারের প্রচলিত প্রচার ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম ও ভিডিওর মাধ্যমে যে প্রচারণা চালিয়েছে, তা বিজেপির শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিয়েছে। আন্দোলনের সময় কিছু মূলধারার টেলিভিশন চ্যানেলের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে, এসব চ্যানেল শুরুতে খবর এড়িয়ে গেলেও পরে আন্দোলনকারীদের বিদেশি বা পাকিস্তানি মদদপুষ্ট বলে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করে, যার কড়া জবাব দেয় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অশুতোষ বর্ষ্ণির মতে, রাজনৈতিক বয়ান ও জনমতের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণেই মোদি সরকার ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরাতে বাধ্য হয়েছে। মোদির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত মন্ত্রী হিসেবে পরিচিত ধর্মেন্দ্র প্রধানের এই বিদায় বিজেপির অভ্যন্তরেও নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি বিক্ষোভে অংশ নিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আন্দোলন দীর্ঘদিন ঝিমিয়ে থাকা বিরোধী রাজনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। তবে শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভের মূলে শুধু প্রশ্নফাঁস নয়, বরং বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক স্থবিরতাও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্দোলনের নেতারা স্পষ্ট করেছেন যে এটি তাদের শেষ নয়, বরং শুরু। উত্তর প্রদেশের আসন্ন নির্বাচন এবং ২০২৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও আন্দোলন বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।





