ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে কেন ব্যর্থ হচ্ছে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প?

প্রকাশ:

সাদামাটা হিসাবে বলা যায়, লুটপাটের উৎসব করার পেছনেই মূলত টাকা ব্যয় হয়েছে। যতটুকু কাজের জন্য খরচ হয়েছে, তার পুরোটাই অপরিকল্পিত। সত্য হলো, এই টাকাগুলো আসলে জলে ফেলা হয়েছে, আর এ কারণেই রাজধানীর জলাবদ্ধতা কমছে না। বর্ষা শেষ হলে নতুন বাজেট আসে, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি হয়, ড্রেন বানানো হয়; কিন্তু পাঁচ মাস না পেরোতেই অন্য কোনো খাতের বাজেটে আবার সেই রাস্তা খোঁড়া হয় এবং আগে তৈরি করা ড্রেনগুলো ভেঙে ফেলা হয়। এভাবে বছরের পর বছর অর্থ অপচয় চলছে।

হিমালয় থেকে নেমে আসা পলি থেকে জেগে ওঠা বদ্বীপ বাংলাদেশে এখন জল থেকে জন্ম নেওয়া এই শহর নিজেই জলে হাবুডুবু খাচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকা জল-থইথই হয়ে যায়, এমনকি বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের সড়কেও নৌকা ভাসতে দেখা যায়। আমরা খুব সহজে এর দায় জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর চাপিয়ে দিই। কার্বন নিঃসরণের বিষয়টি অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে এর জন্য প্রয়োজন বৈশ্বিক প্রচেষ্টা। কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে না থেকে আমাদের অভিযোজন ক্ষমতার ওপর জোর দিতে হবে।

মোগল আমলে ইসলাম খাঁ যখন ঢাকাকে রাজধানী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, তখন তিনি ভূগোলের নিয়ম বুঝে ধোলাই খাল খনন করেছিলেন। সেই খাল বুড়িগঙ্গাকে বালু নদীর সঙ্গে যুক্ত করে পানি নিষ্কাশন ও নৌচলাচলের চমৎকার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। অথচ আধুনিক যুগে আমরা কোটি টাকা খরচ করে পাকা রাস্তা ও বহুতল ভবন বানিয়ে সেই প্রাকৃতিক জলপথগুলো বন্ধ করে দিয়েছি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ডুবে যায়, যানবাহনের ইঞ্জিন অকেজো হয় এবং দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত আগের এক দশকে ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন নালা নির্মাণ, ড্রেন সংস্কার ও খাল পরিষ্কারের নামে অন্তত দুই হাজার ১৪৬ কোটি টাকা খরচ করেছে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ১৯টি জলজটপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, মাত্র ১৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই ১২ ঘণ্টায় ঢাকা পরিণত হয় খালের নগরীতে। মিরপুর, ধানমন্ডি থেকে বারিধারা পর্যন্ত প্রতিটি এলাকা ডুবে যায়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নালা বানাতে ৬০৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং ওয়াসা ড্রেনের পেছনে ১০০ কোটি টাকা ঢালে। পরবর্তী চার বছরে দুই সিটি করপোরেশন ব্যয় করে আরও ৭৩০ কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের টাকা কোথায় গেল, তা এক বড় প্রশ্ন।

গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ পলিথিন ও অপচনশীল প্লাস্টিক। ড্রেনের মুখে আটকে থাকা এসব বর্জ্য পানি চলাচলে বাধা দেয়। যদিও দায় নীতিনির্ধারকদেরই বেশি। চারদলীয় জোট সরকারের সময় পলিথিন নিষিদ্ধ করা হলেও তা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। নেদারল্যান্ডস বা জাপানের মতো দেশগুলো যেখানে মাটির নিচে বিশাল ওয়াটার রিজার্ভার বা পাম্প ব্যবহার করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আধুনিক করেছে, সেখানে আমরা ড্রেন বানালেও পানি কোথায় গিয়ে মুক্ত হবে, তা নিয়ে ভাবছি না। যতদিন এই পরিকল্পনার অভাব থাকবে, ততদিন জলের জন্য বরাদ্দ করা টাকা জলেই যেতে থাকবে।

শেয়ার করুন