শিক্ষার্থীদের নিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবমাননাকর মন্তব্যের নেপথ্যে

প্রকাশ:

জুলাই বিপ্লবের পর রাজনৈতিক বাস্তবতার আমূল পরিবর্তনের বিষয়টি অনেক রাজনীতিকই এখনো অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা এখন রাজনীতির ময়দানে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, যারা দুর্নীতি ও মুরুব্বিপনার পুরনো অভ্যাস আর নির্বিচারে মেনে নিতে প্রস্তুত নন। বিশেষ করে অতিবৃষ্টির কারণে এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় শিক্ষামন্ত্রীর ‘ফার্মের মুরগি’ সংক্রান্ত অবমাননাকর মন্তব্য জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। যদিও মন্ত্রী পরে সংসদে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছেন, তবুও এই তাচ্ছিল্যপূর্ণ তুলনা শিক্ষার্থীদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছে।

শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ মূলত তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে ছিল, যা কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়। রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও যাতায়াত ব্যবস্থার চরম দুরবস্থার পেছনে শিক্ষার্থীদের কোনো দায় নেই, বরং এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতারই প্রতিফলন। এই ব্যর্থতা স্বীকার না করে উল্টো শিক্ষার্থীদের অভিযুক্ত করা ছিল নজিরবিহীন। এর আগে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে একই ধরনের শ্লেষাত্মক মন্তব্য করেছিলেন, যার প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে ব্যর্থতার দায় বিগত ও বর্তমান সরকারগুলো এড়িয়ে যেতে পারে না, অথচ সেই ব্যর্থতার জন্য শিক্ষার্থীদের উপহাস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা অন্ধ আনুগত্যের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছে। প্রবীণ রাজনীতিকদের বুঝতে হবে যে, সম্মান দাবি করে পাওয়া যায় না, বরং তা অর্জন করতে হয়। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাঘা বাঘা রাজনীতিকরা যা করতে ব্যর্থ হয়েছেন, এই তরুণরা রক্ত দিয়ে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে তা করে দেখিয়েছেন। যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তারা জীবন দিয়েছেন, সেই গণতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে দাবিদার রাজনীতিকদের কাছ থেকে উপদেশ শোনার ধৈর্য শিক্ষার্থীদের থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক।

বিএনপির অভ্যন্তরে একশ্রেণীর রাজনীতিক জুলাই বিপ্লবের তাৎপর্য খাটো করে দেখার চেষ্টা করছেন, যা তাদের রাজনৈতিক ভুল ধারণার পরিচয় দেয়। সরকার এখন মন্ত্রিসভায় শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি ও চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, যারা স্বৈরাচারী আমলে বিদেশে পাচার করা অর্থে আয়েশে থেকেছেন বা ক্ষমতার সুবিধাভোগী ছিলেন, তাদেরই ‘ফার্মের মুরগি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যৌক্তিক। জুলাই বিপ্লবের অর্থ কেবল দুর্নীতিবাজদের বদলে সমমানের অন্য কাউকে বসানো নয়; এই বিপ্লব শিক্ষার্থীদের রাজনীতির নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

শেয়ার করুন