বাংলাদেশে বন্যা নতুন কোনো বিষয় নয়। বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও নদীভাঙনের ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়া একটি নিয়মিত ঘটনা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সমস্যাটি নগরাঞ্চলের জন্য একটি বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকা দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতায় ভুগছে, আর বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টানা কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই শহরটির বহু এলাকা তলিয়ে যায়, স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন এবং চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ।
চট্টগ্রামের এই জলাবদ্ধতার জন্য অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল-নালা দখল এবং জলাধার ভরাটকে দায়ী করা হচ্ছে। এক সময়ের প্রাকৃতিক খালগুলো, যা বর্ষার পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, সেগুলো এখন ভরাট বা সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। তবে ঢাকার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন; সেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ও সিটি করপোরেশনের তুলনামূলক সক্রিয় ভূমিকার কারণে জলাবদ্ধতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ থাকলে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব।
সম্প্রতি চট্টগ্রামে রেকর্ড বৃষ্টিপাতের পর সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে সিটি মেয়র ডা: শাহাদাত হোসেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন এবং ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড, জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। তবে শুধুমাত্র জরুরি তৎপরতা বা ত্রাণ বিতরণই স্থায়ী সমাধানের পথ নয়।
জলাবদ্ধতা একটি কাঠামোগত সমস্যা, যার মূলে রয়েছে একাধিক সরকারি সংস্থার সমন্বয়হীনতা। সিটি করপোরেশন, সিডিএ, ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং পরিবেশ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাজের মধ্যে প্রায়ই অসামঞ্জস্য দেখা যায়। এক সংস্থা খাল খনন করলে অন্য সংস্থা রাস্তা তৈরির সময় তা বাধাগ্রস্ত করে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতার অভাব এবং নাগরিক সচেতনতার অভাবে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও সুফল মিলছে না। বিশেষ করে খাল-নালায় প্লাস্টিক ও বর্জ্য ফেলার প্রবণতা অবকাঠামোকে অকার্যকর করে তুলছে।
চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হওয়ায় এখানকার জলাবদ্ধতা জাতীয় অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ। তাই কেবল প্রকল্প গ্রহণ নয়, প্রকল্পের গুণগত মান ও কার্যকারিতা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা কাঠামো, সংস্থাগুলোর মধ্যে দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলেই জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ী মুক্তি পাওয়া সম্ভব।




