বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে গত দেড় দশকের অচলাবস্থা ও রাজনৈতিক মেরুকরণের অবসান ঘটিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। পঞ্চদশ সংশোধনীর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্টের রায়ই বহাল রেখেছেন। এর ফলে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের অধিকার ফিরে আসার আইনি পথ প্রশস্ত হয়েছে। এটি জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষার এক অসামান্য আইনি স্বীকৃতি।
১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছিল। তৎকালীন সরকার সংবিধানের ৫৪টি মৌলিক পরিবর্তন এনে ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করে সংবিধানের একটি অংশকে অপরিবর্তনীয় ঘোষণা করেছিল, যা নির্বাচনব্যবস্থাকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনসহ বিশিষ্ট নাগরিকদের দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীর বেশ কিছু ধারাকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী আখ্যা দিয়ে বাতিল করেন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সেই আপিলগুলো খারিজ করে দিয়ে হাইকোর্টের রায়কেই চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত হিসেবে বহাল রেখেছেন।
আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির জানান, আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, গণভোট, ৭(ক)/৭(খ) অনুচ্ছেদ এবং নিম্ন আদালতের রিট ক্ষমতা—এই চারটি মৌলিক বিষয়ের নিষ্পত্তি করেছেন। সংবিধানের অন্যান্য প্রায় ৫০টি নীতিগত বিষয় ভবিষ্যৎ সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, বর্তমান সংসদের এই কাঠামোটি পুনরায় নির্ধারণ করার ক্ষমতা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিন আগে নির্বাচনসহ কিছু কারিগরি ও আইনি জটিলতা নিরসনে সংসদকে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আইনি পথ খুললেও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলো এখন কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ‘সার্চ কমিটি’ বা পুরনো কাঠামোর সমন্বয় ঘটাবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দরকষাকষি শুরু হতে পারে। এছাড়া বিএনপি যদি তাদের রাজনৈতিক দর্শন অনুযায়ী সংবিধানে পরিবর্তন আনতে চায়, তবে ভবিষ্যতে নতুন সংশোধনী আনার প্রয়োজন হতে পারে।
আদালতের এই রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গণভোট প্রথার প্রত্যাবর্তন, যা জনগণের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করবে। এখন থেকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কেবল সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট হবে না, বরং সাধারণ মানুষের ভোটের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। তবে কেবল আইনের কিতাবে পরিবর্তন নয়, দেশে সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন আবশ্যক। সংসদকে এখন এমন একটি যুগোপযোগী নির্বাচনকালীন রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে, যা কেবল কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং পুরো জাতির আস্থার প্রতীক হয়ে উঠবে।




