বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে শান্তির অর্থনৈতিক করিডোর গড়ার সময় এসেছে

প্রকাশ:

একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে এশিয়া এখন প্রবৃদ্ধির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলটি দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মতো বড় শক্তিগুলোর এখানে নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। এই বাস্তবতা সামনে রেখে প্রশ্ন উঠছে, এই অঞ্চল কি বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হবে, নাকি শান্তি ও যৌথ সমৃদ্ধির উদাহরণ হয়ে উঠবে?

বন্দর, রেলপথ ও ডিজিটাল সংযোগব্যবস্থা যদি কেবল কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা উত্তেজনার কারণ হতে পারে। কিন্তু এগুলোকে যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের উপায় হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে তা শান্তির শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করবে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে একটি প্রাকৃতিক সেতু হিসেবে কাজ করার অনন্য সুযোগ রাখে। তবে বাংলাদেশের লক্ষ্য প্রতিবেশীদের ওপর নেতৃত্ব প্রদান নয়, বরং একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী ও সংলাপের আহ্বায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখা।

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়—আজকের বিভক্ত বিশ্বে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এটি কোনো আদর্শিক বক্তব্য নয়, বরং একটি কার্যকর কূটনৈতিক পথ। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার বর্ধিত সহযোগিতা বা বিমসটেকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো প্রমাণ করে যে শান্তি ও উন্নয়নের জন্য যৌথ প্রচেষ্টার গুরুত্ব বাড়ছে। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কাসহ এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশ যদি উন্নয়নের সুফল পায়, তবেই দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।

গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য এই পারস্পরিক সহযোগিতার তাৎপর্য গভীর। বিশাল জনসংখ্যা ও তরুণ কর্মশক্তির এই দেশগুলো সমতার ভিত্তিতে বিশ্ব অংশীদারিত্ব গড়ে তুললে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরও সম্মানজনক ভূমিকা রাখতে পারবে। একবিংশ শতাব্দীর সাফল্য কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করবে না, বরং কে কত বেশি মানুষের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে তার ওপরই প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে। সঠিক নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলো বিশ্বকে দেখাতে পারে যে ভূগোল কেবল প্রতিযোগিতার কারণ নয়, বরং শান্তি ও মানবিক অগ্রগতির সেতু হতে পারে।

শেয়ার করুন